বাংলাদেশের নিউজরুমে এআইয়ের প্রভাব, স্বনিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করলেও এটি জরুরি নৈতিক উদ্বেগ তৈরি করছে।

আজ সোমবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বিশেষজ্ঞরা এমন মত দিয়েছেন।

‘বাংলাদেশি গণমাধ্যমে এআই-এর নৈতিক ব্যবহার’ শীর্ষক এ পলিসি ডায়লগটি যৌথভাবে আয়োজন করে দ্য ডেইলি স্টার ও মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। ডায়লগটি আয়োজনে সহায়তা করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।

অনুষ্ঠানে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন গণমাধ্যমে এআই ব্যবহারের আইনি নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি এমন যে, কোনো সমস্যা দেখা দিলেই আমরা আইন দিয়ে তা সমাধান করতে চাই। এআইয়ের জন্য আইনি কাঠামোর দিকে এগোলে আমরা পরোক্ষভাবে সরকারের হাতে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আরেকটি হাতিয়ার তুলে দেবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইন সাধারণত স্বাধীনতাকে প্রসারিত করার চেয়ে সীমাবদ্ধ করতেই তৈরি করা হয়।’

প্রথম আলোর অনলাইন বিভাগের প্রধান শওকত হোসেন বলেন, ‘এআই সংক্রান্ত নীতিমালা সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। বাইরের কারো এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের এআই-সংক্রান্ত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় বর্তমান সময়ে সরকারি নীতিমালার আকাঙ্ক্ষা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’

সাংবাদিক তালাত মামুন প্রস্তাব করেন, দেশের ১০ থেকে ১৫টি শীর্ষ গণমাধ্যম নিজস্ব এআই মানদণ্ড নির্ধারণ করতে সক্ষম হলে তা একটি ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি করবে। এতে গণমাধ্যম নিজেদের কার্যকরভাবে স্ব-নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’

এমআরডিআই এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান জানান, প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন—সব প্ল্যাটফর্মের জন্য প্রযোজ্য একটি সমন্বিত এআই নির্দেশিকা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা যেকোনো গণমাধ্যম সহজেই গ্রহণ করতে পারবে।

বক্তারা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এআইয়ের বর্তমান ব্যবহার সম্পর্কেও আলোচনা করেন। 

শওকত জানান, প্রথম আলোর ‘শর্টস’ অ্যাপে ৬০ শব্দের খবরের সারাংশ প্রায় সম্পূর্ণটাই এআই দ্বারা তৈরি। তবে সাংবাদিকদের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা এখনও এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি। কিন্তু এ চলমান ধারা থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে পারি না। যত দেরিই হোক, আমাদের এর সঙ্গে একীভূত হতেই হবে।’

এআই প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন সতর্ক করেন, ‘দক্ষতা ছাড়া এআই এর ব্যবহার বড় ধরনের ভুলের কারণ হতে পারে।’

ইউল্যাবের ড. সুমন রহমান ‘প্রম্পট রাইটিং’ দক্ষতা আয়ত্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘এতে করে পক্ষপাত ও ভুল তথ্য এড়ানো সম্ভব।’

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ড. সুসান ভিজে জানান, সাংবাদিকদের এআই টুল ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে জাতিসংঘ কাজ করছে। নির্বাচনের আগে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়াদের অনেকের মধ্যেই এআই সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব দেখে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়েছি।’

তিনি এআই ব্যবহারে বাংলাদেশে স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও বাস্তব উপযোগিতা এবং নমনীয় আচরণবিধি প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের উদাহরণ তুলে ধরে গণমাধ্যমে এআই ব্যবহারের দক্ষতার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও নির্ভরযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দেন সুসান।