কার্যকারিতা হারাল অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ আজ থেকে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বিশেষ করে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর বৈধতা থাকছে না।
এর মধ্যে সাতটি অধ্যাদেশ চারটি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার পর সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ সেগুলো অনুমোদিত না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে আছে গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং রেফারেন্স ও পুলিশ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
সবগুলো অধ্যাদেশ পাস করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে ঐকমত্য ভঙ্গ ও আস্থা সংকটের অভিযোগ জানায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এরপর গতকাল শুক্রবারের অধিবেশনের শেষের দিকে তারা ওয়াকআউট করে।
অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এটি ‘ফ্যাসিবাদকে পুনর্জন্ম দেবে’ এবং এর দায় কোনোভাবে বিরোধী দল নেবে না।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদকে জানান যে, অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনটি পথ খোলা থাকে।
তিনি বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো আপনার (স্পিকার) সামনে উপস্থাপন করতে হবে এবং আমরা তা করেছি। যদি কোনো অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা না হয়, তবে তা বাতিল হয়ে যায়। আর যেগুলো উপস্থাপন করা হয়, সেগুলো বিল আকারে পাস করতে হয় নতুবা বাতিল করতে হয়।
বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ ২০২৪, সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।
বাতিল হওয়া ১৩টি অধ্যাদেশ হচ্ছে—২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুটি, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ৫ এপ্রিল থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ৯১টি বিল পাস করেছে। এর মধ্যে চারটি বিলের মাধ্যমে সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে।
৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার মতো অধ্যাদেশও রয়েছে।
শুধু শেষ দিনেই ২৪টি বিল পাস হয়েছে। এর আগে ৫ এপ্রিল দুটি, ৬ এপ্রিল সাতটি, ৭ এপ্রিল ১৪টি, ৮ এপ্রিল ১৩টি ও ৯ এপ্রিল ৩১টি বিল পাস হয়।
অধিবেশনের প্রথম দিন ১২ মার্চ আইনমন্ত্রী ১৩৩টি অধ্যাদেশই উপস্থাপন করেন, যা পরে পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়।
২ এপ্রিল কমিটির চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে অনুমোদন, ১৫টি সংশোধিত আকারে অনুমোদন, চারটি বাতিল এবং ১৬টি অধ্যাদেশ পরে আরও শক্তিশালী বিল হিসেবে পুনরায় পেশ করার সুপারিশ করা হয়।
যদিও কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সংসদ সেগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরোনো আইনটি পুনর্বহাল করেছে।
একইভাবে কমিটি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে পাসের পরামর্শ দিলেও সেটি আর আনা হয়নি।
২৪টি বিল পাস
গতকাল পাস হওয়া ২৪টি বিল হলো—নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল ২০২৬, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, আমানত সুরক্ষা বিল, আবগারি ও লবণ (সংশোধন) বিল, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল ২০২৬, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আইন সংশোধন বিল, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল, সাইবার নিরাপত্তা বিল, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল, জুলাই গণঅভ্যুথ্থানের শহীদ পরিবারের ও আহত ছাত্র-নাগরিকদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ব্যাংক রেজোলিউশন বিল, অর্থ (২০২৫-২৬ অর্থবছর) বিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল।
বিরোধী দলীয় এমপিরা ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ বিলের ওপর আপত্তি জানালেও কণ্ঠভোটে সেগুলো পাস হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল পাসের পর উত্তপ্ত বিতর্কের জেরে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দুবার ফ্লোর নিয়ে বলেন, যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে পাসের বিষয়ে একমত হওয়া গিয়েছিল, এটি তার মধ্যেই ছিল এবং বিরোধী দল সেই ঐকমত্য রক্ষা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা দিনের আলোয় চালাকি এবং সরাসরি প্রতারণা দেখতে পেলাম।
ওয়াকআউটের আগে শফিকুর রহমান বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটি এবং উপদেষ্টা কমিটি—উভয়ই ১৩৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু আমরা অনেক বিল দেখতে পাচ্ছি না। গুম, পুলিশ কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। আমরা বাকি অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই।
আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার কমিটির প্রতিবেদন থেকে বিচ্যুত হয়নি এবং গুম ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন যে, কিছু বিল আরও যাচাই-বাছাই শেষে পুনরায় আনা হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, সব অধ্যাদেশ অনুমোদন না করা ঐকমত্যের বরখেলাপ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের পর স্পিকার বলেন, বাকি বিলগুলো আগামী অধিবেশনে পেশ করা হবে।
শফিকুর রহমান তখন অভিযোগ করেন যে বিরোধী দলকে ‘ব্ল্যাকআউট’ করা হচ্ছে। জবাবে স্পিকার বলেন, ওয়াকআউট করা বিরোধী দলের অধিকার।
শফিকুর বলেন, আপনি সবার জন্য ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ আমরা আপনার কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।
আইনমন্ত্রীর আরও ব্যাখ্যার পর শফিকুর বলেন, ইনশাআল্লাহ, এই ঘরে আবার দেখা হবে। তবে আজকের মতো আমরা দুঃখের সাথে ওয়াকআউট করছি।
সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৩৭ মিনিটে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যরা কক্ষ ত্যাগ করেন। এরপর সংসদ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিলটি পাস করে।
‘সরকার আমাদের শিশু মনে করে’
ওয়াকআউটের পর এক সংবাদ সম্মেলনে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন যে সরকার ‘কৌশলের’ মাধ্যমে বিরোধী দলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা কমলালেবু হাতে নিয়ে শিশুকে যদি নেড়েচেড়ে দেখানো হয়, সে বুঝতে পারে না সেটা আসল না প্লাস্টিক। তখন সে সেটার দিকে দৌড় দেয়। তারা হয়তো আমাদের সেরকম শিশু ভেবেছে।’
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের বিষয়ে আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে।
উভয় নেতা বলেন, বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং সংসদের কার্যপ্রণালীগত অনিয়মের প্রতিবাদে এই ওয়াকআউট করা হয়েছে। তারা জনগণের অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।