ঐকমত্য কমিশনে কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে গণতন্ত্র কোথায় ছিল: সারা হোসেন

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, ‘কয়েকজনকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে ঐকমত্যের কমিশন, তাকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না। এটি একটি নির্বাচিত (সিলেক্টেড) প্রক্রিয়া।’

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে সারা হোসেন এসব কথা বলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈঠকে অংশ নিয়ে সারা হোসেন বলেন, ‘আমি একটু ভিন্নমত পোষণ করব। বারবার বলা হচ্ছে যে জুলাই সনদ আমাদের রাখতেই হবে এবং গণভোটের ফলাফল আমাদের রাখতে হবে। বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন যে এটা একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এসেছে। কিন্তু আপনাদের যে ঐকমত্য কমিশন, এটাকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না। কয়েকজন মিলে বসে আপনারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, এখানে গণতন্ত্র কোথায় ছিল? বাইরে থেকে কে কথা বলছে? কেউ না।’

সংস্কার কমিশনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘কমিশনে একজন নারীও ছিলেন না, অথচ পুরো বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছে। আমাদের অল্প হলেও কয়েকজন নারী বিচারপতি আছেন, বিচারপ্রার্থী অনেক নারী আছেন। অথচ সেখানে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যে অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।’

গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সারা হোসেন বলেন, ‘গণভোটে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের যদি জিজ্ঞেস করি, গণভোটের তৃতীয় প্রশ্নটি কী ছিল বা আরও যে ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব আছে, সে সম্পর্কে আপনারা জানেন কি না? খুব কম মানুষই বলতে পারবেন। আপনি কিসের জন্য ভোট দিচ্ছেন, সেটি জানা জরুরি।’

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই চাই বিচার বিভাগ আর কখনো নির্বাহী বিভাগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হোক। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, সব বিচারপ্রার্থী যেন ন্যায়বিচার পান। এ জন্য দুটি আইন (বিচারপতি নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন) অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। এই আইনগুলোর মাধ্যমে বিচারপতিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড তৈরি হয়েছিল, যা আগে ছিল না।’

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আর্থিক স্বাধীনতা না থাকার কারণে বিচার বিভাগকে অনেক ভুগতে হয়েছে। একজন বিচারপতিকে তার ফাইল রাখার জন্য একটি পেনড্রাইভ কিনতে হলেও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এই অবস্থা থেকে তাদের অবশ্যই মুক্ত হওয়া উচিত। বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি এর কর্মীদের নিয়ন্ত্রণও সুপ্রিম কোর্টের হাতে আসা উচিত।’

ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন ও গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, ‘পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলে তার কী কী রক্ষাকবচ থাকবে, তা আইনে বলা আছে। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি, হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজনকে বারবার ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানো হচ্ছে। আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাইলে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে অনুমোদিত আইনগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।’

‘গত ১৫-১৭ বছরে আমরা দেখেছি, কীভাবে বিচারপতি এস কে সিনহাকে জোর করে বিদায় করা হয়েছিল। সে বিষয়ে আমরা নাগরিক সমাজ থেকে জোরালো কোনো দাবি তুলিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেখলাম, ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা পদত্যাগ করলেন। এরপর এমন কয়েকজন বিচারপতিকে বসিয়ে দেওয়া হলো, যাদের আমরা দক্ষ হিসেবে জানতাম এবং যাদের কাছ থেকে মাইলফলক রায় পেয়েছি। শেষমেশ তারাও পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।’

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রসঙ্গ টেনে সারা হোসেন বলেন, ‘আপনারা হয়তো তাকে অনেকেই পছন্দ করেন না। তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিতর্কিত রায়টি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এখন অনেক মাস ধরে জেলখানায় বন্দী। তিনি রায় লেখার জন্য জেলে নেই, তাকে জুলাইয়ের হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এত মাস পার হয়ে গেলেও এমন কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি, যেখানে বলা হয়েছে যে বিচারপতি খায়রুল হক দাঁড়িয়ে থেকে গুলি চালিয়েছেন বা গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। সম্পূর্ণ মিথ্যাভাবে তাকে এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে নাগরিক সমাজ চুপ হয়ে আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি, বিচারপতিরা রায় দেওয়ার সময় পেছনে তাকাতে বাধ্য হতেন যে গোয়েন্দা বাহিনীর কেউ বসে আছে কি না। জাস্টিস সিনহা যখন দেশ ছাড়েন, আমার মনে হয় গোয়েন্দা বাহিনীর কারণেই তাকে যেতে হয়েছিল। আবার যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের সামনে হয়তো কোনো ভয়-ভীতি ছিল। এই অবস্থা থেকে আমাদের বের হতে হবে।’

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। এতে আরও বক্তব্য দেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী, ফাহিম মাশরুর প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।