বিএনপি সরকারের ১০০ দিন: আইন-শৃঙ্খলায় প্রত্যাশিত উন্নতি নেই

তৌসিফ কাইয়ুম
তৌসিফ কাইয়ুম
মুনতাকিম সাদ
মুনতাকিম সাদ

আলোচিত কয়েকটি হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও গণপিটুনির ঘটনার পর আবারও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনের আগে জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। ক্ষমতায় আসার পরও সরকার একই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান উন্নতি এখনো দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের মেয়াদ শেষে বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ওই সময়টিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছিল হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরাধ দমনে কয়েকটি অভিযান চালালেও মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ, গণপিটুনি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ১৯ মে। ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ড, গ্যাং-সংঘর্ষ এবং পারিবারিক বিরোধে খুনের ঘটনাও সামনে এসেছে।

মার্চ ও এপ্রিল মাসের অপরাধের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের উপাত্ত বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ডাকাতি ২০২৫ সালে বেড়ে গেলেও ২০২৬ সালে কিছুটা কমেছে, তবে তা এখনো ২০২৪ সালের চেয়ে বেশি।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে তা কিছুটা কমলেও ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি রয়েছে। একই প্রবণতা দেখা গেছে পুলিশের ওপর হামলার ক্ষেত্রেও।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণপিটুনির ঘটনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৩২টি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৭১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিলেই ৬৯টি ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৫ জনের।

সরকার গঠনের পর বাজার, পরিবহন খাত, জমি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে আসে। পরে সরকার দেশব্যাপী অপরাধী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করলেও এখনো দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, সরকার গঠনের প্রায় ১০০ দিন পেরিয়ে গেলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি চোখে পড়ছে না।

তার ভাষায়, মানুষ আশা করেছিল নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু এখনো গণপিটুনি, নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর পুলিশে যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। তবে মাত্র ১০০ দিনে পুরো পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, নানা উদ্যোগের পরও বড় ধরনের অপরাধ ঘটছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঠেকানো যায়নি, এটা দুঃখজনক। তবে বিভিন্ন ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তার দাবি, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান চলছে এবং শিগগির পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীতে বদলি, মনোবল সংকট ও প্রশাসনিক অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে বাহিনীর কার্যকারিতা কমে গেছে।

তার মতে, নতুন সরকার গঠনের পর মানুষ যে ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ আশা করেছিল, তা এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষণ, নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতায় ঘাটতি থাকায় অপরাধ সংঘটনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।