লাউয়াছড়ায় কমেছে বন্যপ্রাণী, বেড়েছে পানির বোতল-পলিথিন
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণ কমে গেছে। অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত মানুষের আনাগোনা, গাছ ও বাঁশ অবৈধভাবে নিধন এবং বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়কপথ নির্মাণসহ নানা কারণে সংরক্ষিত এ বনাঞ্চল পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ময়লা-আবর্জনায় ভরে উঠেছে। একসময়ের ঘন ও বৈচিত্র্যময় এই অরণ্য এখন পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
দেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
একসময় এই উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি ছিল। এর মধ্যে ছিল ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি ও ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। তবে বর্তমানে বাস্তব সংখ্যা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, বনে প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো—রেল ও সড়কপথ। বনের ভেতর দিয়ে চলাচল করা ট্রেন ও যানবাহনের ধাক্কায় প্রতিনিয়ত বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে।
গাছ ও বাঁশ চুরি এবং জমি দখল
সীমানা প্রাচীর না থাকায় বনের জমি দখল ও মূল্যবান গাছ চুরির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী চা বাগান থেকে কীটনাশক মিশ্রিত পানি ছড়া বেয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। যা বন্যপ্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮-১৯ সালে লাউয়াছড়ায় পর্যটক প্রবেশ করেছিলেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮১২ জন। করোনার কারণে দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৩-২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৬৭২ জনে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৫ জন।
সরেজমিনে বনের ভেতরে কোনো বন্যপ্রাণীর দেখা মেলেনি। স্থানীয়রা বলছেন, একটা সময় এই বন এতটাই ঘন ছিল যে, সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পড়তো না। এখন সেই ঘনত্ব নেই। আগে বনের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে বন্যপ্রাণী দেখা গেলেও এখন বানর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সাজিদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ৫ বছর আগে এই বনে ঢুকছিলাম। তখন মনে হয়েছিল অন্য এক দুনিয়ায় আসছি। এবার ঢুকে মনে হলো—কোনো বাজারের পাশের ডোবায় এসেছি। চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, পলিথিন—যেখানে বসে, সেখানেই ফেলে যায়। সাধারণ মানুষ আসে বেড়াতে, কিন্তু বনটা যে শ্বাস নেয়, সেটা বোঝে না।
স্থানীয় সাজু মারছিয়াং বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে এই বনের পাশে বড় হয়েছি। বাবার মুখে শুনেছিলাম, একসময় ভোরবেলায় উঠানে দাঁড়ালেই উল্লুকের ডাক শোনা যেত। মা বলতেন, রাতে হরিণ বাড়ির কাছে চলে আসত। সেই দিন এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।
তিনি বলেন, এখন সকালে দেখি—ট্যুরিস্টবাহী মাইক্রোবাস আর প্রাইভেটকার বনের মুখে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। দল বেঁধে মানুষ ঢোকে, হইহুল্লোড় করে বেরিয়ে আসে। যাওয়ার সময় পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, কোল্ড ড্রিংকের বোতলসহ সব ময়লা বনের ভেতরেই রেখে যায়।
‘সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন দেখি—ছড়ার পানিতে প্লাস্টিক ভাসছে। এই ছড়ার পানি আমরা ব্যবহার করি। এছাড়া আমাদের গরু-ছাগলসহ বনের প্রাণীরাও পান করে। পানি নষ্ট হলে সবার ক্ষতি। কিন্তু কে বোঝাবে এই মানুষগুলোকে? ওরা ছবি তুলে চলে যায়, ময়লাটা বনের জন্য রেখে যায়’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতি মৌলভীবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন ডেইলি স্টারকে বলেন, পর্যটন মানেই ক্ষতি নয়, কিন্তু অপরিকল্পিত ও অসচেতন পর্যটন লাউয়াছড়ার জন্য বিষের মতো কাজ করছে। বছরে দেড় লাখের বেশি মানুষ এই বনে প্রবেশ করছেন, অথচ প্রবেশপথে একটা ডাস্টবিনও নেই। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কাঠামো নেই। ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে মেশে, ছড়ায় ভাসে, প্রাণীরা খেয়ে মরে।
তিনি আরও বলেন, সমস্যা শুধু ময়লায় নয়। পর্যটকদের উচ্চস্বরে কথা বলা, জোরে গান বাজানো, দল বেঁধে ট্রেইলের বাইরে হাঁটা এসবও প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ নষ্ট করছে। প্রজনন মৌসুমে এই উপদ্রব মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উল্লুক, বনমোরগ, অজগর—এরা এখন বনের গভীরে সরে গেছে, কারণ মানুষের চাপে সামনে আসতে পারছে না।
লাউয়াছড়া পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, লাউয়াছড়াটাকে সবাই ডাস্টবিনে তৈরি করেছে। প্রাণীরা এখন নিরাপদ নয়, বনে খাবারের সংকটও রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে বনে প্রাণীরা থাকবে না। পর্যটক প্রবেশ কমাতে হবে। রেল ও সড়কপথে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাহলে যে টুকু প্রাণী আছে, এগুলো রক্ষা করা যাবে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গলের রেঞ্জ অফিসার কাজী নাজমুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা কিছু দিন পরে পরে লাউয়াছড়ার ময়লা পরিষ্কার করি। ট্যুরিস্ট যদি সচেতন না হয়, তাহলে ম্যানটেইন করা একটু কষ্ট হয়ে যায়। তবু আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।