ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর এক গ্রাম
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নালতা গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে বহুতল সব বাড়ি যা গ্রামের চিরাচরিত দৃশ্যের সঙ্গে একেবারেই যায় না।
বিভিন্ন রঙে রাঙানো এসব বাড়িতে আছে সুন্দর বারান্দা, টাইলস করা প্রবেশপথ এবং ঝকঝকে কাচের জানালা। পাশেই নারকেলগাছ ঘেরা পুকুর ও সরু পথ।
স্থানীয়রা এই গ্রামটিকে ‘ইতালি গ্রাম’ বলে ডাকেন। গত চার দশক ধরে এই গ্রামের মানুষের ঝোঁক ইতালি যাওয়ার প্রতি। এই প্রবণতা গ্রামটিকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বদলে দিয়েছে। এখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ ইতালিতে থাকেন। যারা আছেন তাদের অনেকেই ইউরোপের এই দেশটিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে নালতা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক ফারাজ আলী ঢালীর কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এই গ্রামের ৯০ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো আত্মীয় ইতালিতে থাকেন। এ জন্যই মানুষ একে ইতালি গ্রাম বলে ডাকে।’
এই গ্রামের সঙ্গে ইতালির সম্পর্কের গল্পটি শুরু হয় আশির দশকে।
সে সময় বন্যা ও নদীভাঙন নড়িয়া উপজেলার হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে যায়। এটিই মূলত ওই সময় ইতালিতে পাড়ি জমানোর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।
স্থানীয় সাংবাদিক মাহবুব আলম বলেন, শরীয়তপুরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। ১৯৮৮, ১৯৯৮ এবং ২০০৪ সালের বড় বন্যায় এখানে ফসল নষ্ট হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘরবাড়ি হারায় হাজারো মানুষ।
তিনি বলেন, ‘এসব মানুষের বেশির ভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। অনেকেই একটু ভালো থাকার আশায় ইতালিতে পাড়ি জমান। আর তাতেই তাদের জীবনের চাকা ঘুরে যায়।’
৫৮ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী সেই পুরোনো প্রবাসীদের একজন।
আশির দশকের শুরুতে নড়িয়ার ছোট একটি দলের সঙ্গে ইতালিতে গিয়েছিলেন তার মামা মতিউর রহমান ভুলু। সেই মামার হাত ধরেই ১৯৮৫ সালে তিনি ইতালিতে যান, সেখানে পড়াশোনা করেন এবং পরে একটি রেস্তোরাঁ খোলেন।
মোহাম্মদ আলী জানান, সে সময় অনেক প্রবাসীই অবৈধ পথে ইউরোপের দেশটিতে যেতেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলে যায়।
১৯৮৭ সালে ইতালি সরকার নথিপত্রহীন শত শত বাংলাদেশিকে বসবাসের বৈধতা দেয়। মোহাম্মদ আলী জানান, নব্বইয়ের দশকে স্পনসর ভিসার মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করে ইতালি, যা নড়িয়ার মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।
বাংলাদেশ ও ইতালিতে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মসহ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মোহাম্মদ আলী জানান, ইতালিতে থিতু হওয়া বাংলাদেশিরা তখন ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতালি যেন এই গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বদলে দেয় স্থানীয় অর্থনীতিকে। অনেক পরিবার জমি কিনেছে, মাটির বাড়ি ভেঙে পাকা দালান তুলেছে। কেউ কেউ শরীয়তপুরের পাশাপাশি ঢাকাতেও একাধিক বাড়ি বানিয়েছেন।
কৃষক ফারাজ আলী বলেন, ‘যারা আগে ইতালিতে গেছেন, তারা এখনকার প্রবাসীদের চেয়ে অনেক বেশি আয় করেছেন। অনেক বাংলাদেশি রোম, মিলান ও ভেনিসসহ অন্যান্য শহরে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।’
পরিশ্রমী এবং অপরাধের সঙ্গে কম যুক্ত থাকার কারণে ইতালিতে বাংলাদেশিদের সুনাম রয়েছে বলেও জানান তিনি। সাফল্যের এসব গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর ইতালিতে যাওয়া শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীকে পরিণত হয়।
এই এলাকার শিশুরা ইউরোপের গল্প শুনে বড় হয়। তরুণ-তরুণীরা দেখেন, ছুটিতে ইতালি থেকে ফেরা তাদের প্রতিবেশীরা সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন দামি জিনিসপত্র। ফলে, ইতালিতে গিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখাটা এখানকার মানুষের কাছে প্রায় অবধারিত।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র স্বাধীন সরদার এমন স্বপ্ন নিয়েই বড় হচ্ছে। ১০ বছর আগে তার বাবা লিবিয়া হয়ে ইতালিতে গেছেন। সেখানে তিনি রাঁধুনির কাজ করেন। বড় হয়ে ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে স্বাধীন।
তার বেশির ভাগ সহপাঠীরও একই স্বপ্ন। তার ভাষ্য, ‘স্কুলের খুব কম বন্ধুই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক হতে চায়। বেশির ভাগই বিদেশে যেতে চায়।’
কৃষক ফারাজ আলীর মতে, বিদেশে যাওয়ার এই সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক ছেলে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় না। তারা ভাবে, কোনোমতে ইতালিতে পৌঁছাতে পারলেই হলো, বেশি পড়াশোনার দরকার নেই। সেখানে গিয়ে ইতালীয় ভাষা ও কিছু কাজ শিখে নিলেই চলবে।’
তবে এখন ইতালিতে পাড়ি জমানো আগের চেয়ে অনেক কঠিন। গত কয়েক বছরে বৈধ পথে অভিবাসনের খরচ অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে, ইতালির শ্রমবাজারে যত কর্মীর দরকার, ভিসার চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে, ভাগ্য বদলের আশায় অনেকেই অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
এইপথে লিবিয়া হয়ে যাওয়া অভিবাসীরা প্রায়ই মানব পাচারকারী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর খপ্পড়ে পড়েন। তাদেরকে ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত বন্দিশিবিরে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করা হয়।
মোহাম্মদ আলী বলেন, লিবিয়ার পথ ধরে ইতালিতে যাওয়ার চেষ্টায় অভিবাসীরা শুধু নিজেদের জীবনই ঝুঁকিতে ফেলছেন না, বরং বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছেন। তিনি বলেন, ‘ইতালিতে এত মানুষের দরকার নেই। বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ এখন বেশ সীমিত।’
‘লিবিয়া দিয়ে যাওয়ার রুটটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়ই সমুদ্রে ডুবে মানুষের মৃত্যুর খবর শোনা যায়। ইতালিতে যাওয়ার জন্য কারও এই পথ বেছে নেওয়া উচিত নয়,’ সতর্ক করেন মোহাম্মদ আলী।