হামে আক্রান্ত দুই সন্তানের সেবা করতে করতেই অসুস্থ মা, বাড়ি ফেরার পথে মৃত্যু
হাসপাতালের একটি ছোট্ট বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে দুই বছরের কাইনওয়াই ম্রো আর চার বছরের দংওয়াই ম্রো। হামে আক্রান্ত দুর্বল দুই শিশুর শরীরজুড়ে জ্বরের ক্লান্তি। কখনো তারা কাকার হাত চেপে ধরে, কখনো চারপাশে তাকিয়ে যেন কাউকে খোঁজে।
যাকে তারা খুঁজছে, সেই মানুষটি আর কখনো ফিরে আসবেন না, এ কথা তারা এখনো জানে না।
মাত্র কয়েক দিন আগেও বান্দরবান সদর হাসপাতালের এই ওয়ার্ডেই দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রাত কাটিয়েছেন তাদের মা লেংরুং ম্রো (২৬)। অসুস্থ সন্তানদের সেবা করতে করতেই তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি ফেরার পথেই মারা যান তিনি।
গতকাল শুক্রবার সকালে বান্দরবান সদর হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একই বিছানায় চিকিৎসাধীন দংওয়াই ও কাইনওয়াই। রোগে কাহিল শিশু দুটির চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু মায়ের মৃত্যুর খবর তাদের কেউ জানায়নি।
বিছানার পাশে বসে ছিলেন তাদের ১৯ বছর বয়সী কাকা ক্রংতং ম্রো। চোখের জল আড়াল করে কখনো ভাতিজা, কখনো ভাইঝির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
ক্রংতং ম্রো জানান, তাদের বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম গয়ালেঙ্গা ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামে।
তার ভাষ্য, গত ২৬ জুলাই লেংরুং ম্রো হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। সন্তানদের সেবাযত্ন করতে করতেই ২৮ জুলাই তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান।
চিকিৎসকেরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু দারিদ্র্য, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়ে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পরিবারটি।
ক্রংতং বলেন, ‘আমার বড় ভাই ক্রংসং ম্রো (২৮) লেখাপড়া জানেন না। বাংলা ভাষাও ভালো বলতে পারেন না। তিনি শুনেছিলেন, চট্টগ্রামে চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা লাগবে। তাই স্ত্রীকে চট্টগ্রামে না নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কবিরাজি চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেন। দুই শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর দিয়ে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হন।’
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি লেংরুং ম্রোকে। ২৯ জুলাই বিকেলে গ্রামে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যু হয়। পরদিন পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশু দুটির বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী। ফলে এতিমপ্রায় দুই শিশুর চিকিৎসা, দেখাশোনা এবং হাসপাতালের দিন-রাতের দায়িত্ব এখন কেবল কাকা ক্রংতং ম্রোর কাঁধে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দংওয়াই ও কাইনওয়াই মাঝেমধ্যে কাকার দিকে তাকায়, আবার ওয়ার্ডের দরজার দিকেও চোখ ফেরায়। হয়তো তারা এখনো অপেক্ষা করছে, মা এসে আগের মতো কোলে তুলে নেবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ নেই।
রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ম্রোসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ২৪ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ১৫ জন শিশু, ছয়জন নারী ও তিনজন পুরুষ।
দংওয়াই ও কাইনওয়াইয়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় লড়াই শুধু হাম থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা নয়। হাসপাতালের বিছানায় থাকতেই তারা অজান্তে হারিয়েছে জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, মাকে। সামনে তাদের অপেক্ষায় অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ।