উত্তরাঞ্চলের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র হতে পারে পাবনার মোবারকপুর, খননকাজ শুরু হবে কবে
দেশে সফলভাবে খনন করা গ্যাসকূপগুলোর অধিকাংশই চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। এবার উত্তরাঞ্চলেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
এ লক্ষ্যে পাবনার মোবারকপুরে নতুন করে কূপ খননে একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
এর আগে সেখানে কূপ খননের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এবার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সফলভাবে কূপ খননে চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার পরিচালিত ভূকম্পন জরিপের ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে মোবারকপুরে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সফল হলে এটিই হবে উত্তরবঙ্গের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র।
বর্তমানে পাবনার সুজানগর উপজেলার আহমেদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে অধিগ্রহণ করা ৬ একর জমিতে প্রকল্পের উন্নয়নকাজ চলছে। তবে মূল খননকাজ শুরু হবে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় সফল হয়নি ২০১৪ সালের প্রকল্প
এর আগে ২০১৪ সালে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরতায় কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছিল বাপেক্স। তবে ভূগর্ভে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাবে প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই স্থগিত করতে হয়।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০১৪ সালে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরতায় খননের লক্ষ্যে কাজ শুরু হলেও নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছানোর পর তীব্র গ্যাসের চাপের কারণে তা বন্ধ রাখতে হয়। ওই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার প্রযুক্তি তখন আমাদের কাছে না থাকায় প্রকল্পটি সফল হয়নি।
‘সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরতায় খননকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’, বলে তিনি।
মেগা প্রকল্পের অধীনে নতুন খনন
গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খননের মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সরকার ৯০৯ কোটি টাকা ঋণ দেবে এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন করবে ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পের পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) এস এ এম মেরাজুল আলম ডেইলি স্টারকে বলেন, ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননের জন্য উন্নত কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। এ জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি কূপ খনন ও রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণের কাজ করবে।
তিনি বলেন, সিসিডিসি বর্তমানে কুমিল্লায় খননকাজ চালাচ্ছে। সেখান থেকে রিগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম মোবারকপুরে স্থানান্তর করা হবে।
পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হতে পারে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই ক্ষেত্র থেকে ২০ বছর ধরে দৈনিক অন্তত ২০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
প্রকল্প পরিচালক মেরাজুল আলম বলেন, জমি উন্নয়ন ও পাইলিংয়ের কাজ চলছে। ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি ড্রিলিং শুরু হবে।
সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, মার্চে আহমেদপুর মৌজার ৬ একর জমি বাপেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইল নির্মাণের কাজ গত ২৭ জুলাই শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে।
উত্তরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার মানুষের স্বপ্ন স্থানীয় একটি গ্যাসক্ষেত্রের।
পাবনার দুলাই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক মো. শাহিদুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনার কথা শুনে আসছি। তবে আগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আশা করি, এবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় এর আগে গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের কাজ শুরু হলেও বারবারই ব্যর্থ হতে হয়েছে। তবে একাধিক ভূতাত্ত্বিক জরিপে মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হওয়ায় এবার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে পেট্রোবাংলা ১৯৮০-৮১ সালে মোবারকপুরে ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে গ্যাসের সম্ভাবনার প্রাথমিক ধারণা পায়। পরে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান ১৯৮৩-৮৪ সালে আবারও ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে আশানুরূপ ফল পায়। এছাড়া বাপেক্স ২০০৬-০৭ ও ২০০৭-০৮ সালে আরও দুটি ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়ে সম্ভাবনা পাওয়ায় ২০১৪ সালে কূপ খনন প্রকল্প শুরু করে।
প্রথম দফায় কূপ খনন প্রকল্প সফল না হলেও এবার উন্নত কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পাওয়া এবং গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে বলে মনে করেন পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে যে এলাকায় প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে, সেটি আগের প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো অঞ্চলেই গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত স্থানে একটি কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা গেলে আশপাশে পর্যায়ক্রমে আরও একাধিক কূপ খনন করা যাবে।