রাবিতে সাংবাদিক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ভিডিওতে যে ছাত্রদল নেতাদের দেখা গেছে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রোববার রাতে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী এবং ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীকে শনাক্ত করা গেছে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এর আগে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
ভিডিওতে যে হামলাকারীদের দেখা গেছে
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি।
আরও ছিলেন ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম হাসিব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
হামলার সঙ্গে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তীকে, যিনি পরে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল-গালিবের সঙ্গে রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ডেইলি স্টারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুলকে লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন বিশাল।
এ ছাড়াও, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহকারী দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথি, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি তকবীর হাসান ইমন এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও রাবি ছাত্রদলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলামকে ভিডিও ফুটেজে মারধর করতে দেখা গেছে।
যেসব অপরাধের অভিযোগ রয়েছে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে
২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রদল থেকে আহসান হাবিব ও হাসিবুল ইসলাম হাসিবকে সাময়িক এবং পরবর্তীতে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়। সে সময় আহসান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং হাসিব একজন কর্মী ছিলেন।
পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আবারও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বুধপাড়ায় এই চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ২৫ জুন প্রক্টর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন এবং মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট পরে ঘোষিত ছাত্রদলের কমিটিতে আহসান ও হাবিবকে যথাক্রমে সহসভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
তকবীর হাসান ইমনের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ইমন ও ছাত্রদলের আরেক নেতার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের দুই নেতাকে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মারধর ও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর তাদের একজনের কাছ থেকে নগদ ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ১০ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়।
এই ঘটনায় সাজু নামে পরিচিত সৈয়দ সাজহারুল ইসলামও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অজ্ঞাতনামা আসামি নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য
হামলার প্রতিবাদে ঘটনার দিন রাত দেড়টার দিকে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তাকে হলের প্রভোস্ট দপ্তরে অবরুদ্ধ করেন। তাদের দাবি ছিল, প্রশাসনকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে এবং তাদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলনকারীরা দাবি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব বাতিল এবং পড়াশোনা শেষ করা ব্যক্তিদের সনদ বাতিল করতে হবে।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করেন, হল প্রশাসন এ ঘটনায় মামলা করবে এবং তাদের অন্যান্য দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেবে।
পরবর্তীতে আজ সোমবার শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মনির হোসেন মতিহার থানায় এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানান, হল প্রশাসন মামলা করেছে, তবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেনি।
তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে ইঙ্গিত থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নাম মামলায় উল্লেখ করা যায় না। আসামিরা ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত—এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত মামলায় সংগঠনের পরিচয় লেখা সম্ভব না।’
হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান পরে স্বীকার করেন, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ডেকেছিলাম, কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে যায়।’
নেই সিসিটিভি ফুটেজ
অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা। তারা বলছেন, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব।
তারা দায়ীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে, ঘটনার পর হামলার স্থান থেকে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। যদিও শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, ‘সংস্কারকাজ চলায় সে সময় সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাই কোনো ফুটেজ নেই। ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহত সাংবাদিকেরা হলেন—দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর এহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের মাইনুল ইসলাম রাজু।
