পুলিশের চাকরিতে বাড়ছে মানসিক চাপ, সাড়ে ৭ বছরে ৭৫ জনের আত্মহত্যা

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও…

চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুর আগে পুলিশ কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম তার মেয়েকে এই শেষ বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। পরে যাত্রাবাড়ী থানার অধীন একটি পুলিশ ফাঁড়ির শৌচাগার থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তবে কী কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, তা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার প্রাথমিক তদন্তের বাইরে আর খতিয়ে দেখা হয়নি।

সংকট মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত এই বাহিনীতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে, আর শফিকুলের মৃত্যু এরই একটি উদাহরণ।

এ ধরনের মৃত্যুর তদন্তে প্রায়ই পারিবারিক সমস্যা, দাম্পত্য কলহ, মানসিক চাপ বা মানসিক অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে অধিকতর তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো সীমিত।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৬ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পরবর্তী সময়ে আরও ১১ জন এবং চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আরও আটজন আত্মহত্যা করেছেন। সব মিলিয়ে আট বছরে আত্মহত্যায় প্রাণ গেছে ৭৫ পুলিশ সদস্যের।

নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই ছিলেন কনস্টেবল পদধারী। তালিকায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, একজন সহকারী পুলিশ সুপার, একজন পরিদর্শক, তিনজন উপপরিদর্শক এবং একজন নায়েকও ছিলেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জন সদস্য গলায় ফাঁস দিয়ে, ১৩ জন বিষপানে এবং ১০ জন নিজেদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে মারা গেছেন। দুজন উঁচুস্থান থেকে লাফ দিয়ে এবং একজন গলা কেটে মারা যান।

২৫টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানসিক অস্থিরতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা চাপের সঙ্গে ১১টি, দাম্পত্য সমস্যার সঙ্গে পাঁচটি এবং ব্যর্থ সম্পর্কের সঙ্গে চারটি মৃত্যুর যোগসূত্র পাওয়া গেছে। দুটি মৃত্যুর সঙ্গে আর্থিক সংকট, একটি জুয়া এবং মাদকাসক্তির সঙ্গে একটি মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল। আর পাঁচটির কারণ স্পষ্ট হয়নি।

কয়েকজন পুলিশ সদস্য দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, চাপ, বিষণ্নতা, পারিবারিক কলহ এবং দাম্পত্য সমস্যা সাধারণ বিষয় হলেও অনেকেই সাহায্য নিতে চান না। কারণ, এতে পদোন্নতি ও পদায়নসহ তাদের চাকরিজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশের চাকরিতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, চাপ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে। চরম ক্ষেত্রে এই বিষণ্নতা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘মৌলিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে চাপ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। চাকরিতে থাকাকালীন তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।’

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত ছুটি এবং পরিবারের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে উল্লেখ করে তিনি সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

‘তিনটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন: মৌলিক প্রশিক্ষণ, চাকরির সময় নিয়মিত সহায়তা এবং বিদ্যমান চাকরির বিধিমালা মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক কি না, তা পর্যালোচনা করা’, বলেন তিনি।

বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যরা বলেন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় তারা প্রায় দিনই ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন।

আবাসন, খাবার, ছুটি, বদলি ও পদোন্নতি নিয়েও নানা সমস্যাকে তারা মানসিক চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কনস্টেবল ও দুই এএসআই বলেন, অনেক সদস্য পরিবার থেকে দূরে থাকেন এবং সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খান।

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়াও কিছু সদস্যের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে তারা জানান।

বাংলাদেশ পুলিশে সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার। কিন্তু রাজারবাগের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও সেখানে কোনো স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই এবং একজন আউটসোর্স করা চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে হয়।

২৯২ জন পুলিশ সদস্যের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৮ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ অনুভব করেন, ৯১ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে সীমিত সময় কাটানোর কারণে চাপে থাকেন এবং ৮৩ শতাংশ ঘুমের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। প্রায় ৯৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

২০২০ সালে পুলিশ সদর দপ্তরের করা এক গবেষণায় নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের জন্য সুবিধা, উন্নত আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা, বার্ষিক ছুটি বাড়ানো, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আরও শক্তিশালী মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সুপারিশ করা হয়েছিল।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব সুপারিশের অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, কল্যাণ প্যারেড, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা এবং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘বাহিনী এখন কর্মপরিবেশ, কল্যাণ এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান খান পুলিশ হাসপাতালগুলোতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলর নিয়োগ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সংকটে থাকা সদস্যদের শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

নিম্নপদস্থ সদস্যদের জন্য উন্নত আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য উন্নত করতে চাকরির বিধিমালা সংস্কারেরও সুপারিশ করেন তিনি।

‘মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। পুলিশ সদস্যদের শাস্তি বা চাকরিজীবনে নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কা ছাড়াই সাহায্য নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে’, বলেন তিনি।