ডিসেম্বরে বাড়ি ফেরার কথা, এখন মরদেহের অপেক্ষায় পরিবার
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা গেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা। আগামী ডিসেম্বরেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু, এখন তার বাবা-মা ছেলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর মারা যান ট্রোম্যান। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি পাড়ার সুবিমল খীসা ও গঙ্গা দেবী চাকমা দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে ট্রোম্যান ছিলেন ছোট।
ট্রোম্যান দুই কন্যাসন্তানের পিতা। তার স্ত্রী ও সন্তানরা চট্টগ্রামে নৌবাহিনী কলোনিতে থাকতেন। গ্রামে থাকতেন শুধু তার বাবা-মা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রোম্যান ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যান। এ বছর ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা ছিল তার।
আজ বুধবার সকালে রামহরি পাড়ায় ট্রোম্যানের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বিলাপ করছেন মা গঙ্গা। আশপাশের প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন সুবিমল ও গঙ্গাকে।
দ্য ডেইলি স্টারকে ট্রোম্যানের মা গঙ্গা বলেন, ‘সর্বশেষ মিশনে যাওয়ার আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরের দিকে সামনে থেকে দেখেছিলাম আমার ছেলেটাকে। ভিডিও কলে প্রায়ই কথা হতো। ওই দেশের বিভিন্ন জায়গা দেখাতো, ওর রুম দেখাত। আমাদের বেশি চিন্তা করতে নিষেধ করত। পরিবারের সব খরচও ওই দিতো। পরিবারের সব সমস্যা, অভাবের কথা জেনে সেগুলো পূরণে সবসময় চেষ্টা করত।’
তিনি বলেন, ‘সে মারা গেলেও অমর। কারণ, বিশ্বের জন্য কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে। তবুও আমার মন তো মানে না। মায়ের মন তো…।’
ট্রোম্যানের বাবা সুবিমল বলেন, ‘১৬ সেপ্টেম্বর ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। টিভি কিনেছি কি না, জানতে চেয়েছিল। বলেছিলাম, টিভি কিনতে পারিনি। সে তখন বলল, তোমার টিভি কিনতে হবে না আমি আসার সময় নিয়ে আসবো এবং টিভি দেখার জন্য সব ব্যবস্থা করে দিবো।’
তিনি বলেন, ‘সে যেহেতু দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মারা গেছে, সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, যোগ্যতা অনুসারে ট্রোম্যানের স্ত্রীকে যেন একটা চাকরি দেওয়া হয়। ওর সন্তানরা যেন ভালোভাবে পড়ালেখা করে বেঁচে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা যেন করা হয়।’
ট্রোম্যানের স্ত্রী রুপা চাকমা বলেন, ‘দুই মেয়ে নিয়ে আমি এখন কোথায় যাবো? তাদের লালনপালন কীভাবে করবো, পড়ালেখার কী হবে? তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। সামনে শুধু অন্ধকার দেখছি।’
বুড়িঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসা বলেন, ‘ট্রোম্যান খীসা আমার ভাতিজা। রামহরি পাড়া থেকে একমাত্র সেই নৌবাহিনীতে ছিল। সে ছিল আমাদের গর্ব। গত ২০ সেপ্টেম্বর নৌবাহিনীর মাধ্যমে তার মৃত্যু খবর পাই। তার মরদেহ দেশে আসতে সপ্তাহখানিক সময় লাগতে পারে। আমরা তার দাহক্রিয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি।’
গত ২০ সেপ্টেম্বর ট্রোম্যান খীসার মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফেসবুক পেজে। সেখানে লেখা হয়, আজ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা, ইএ-৩ কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনী তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। তার আত্মত্যাগ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের গৌরবময় অবদানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।