আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফেসবুক পেজে মনিটাইজেশন, মেটার নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো দেশের সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কনটেন্ট থেকে আয় করার সুযোগ নেই। সেই নীতি অনুযায়ী সরকারি সংস্থার পেজ মনিটাইজেশনের আওতাবহির্ভূত।
তবে সম্প্রতি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অন্তত ১৯টি ফেসবুক পেজে মনিটাইজেশন হয়েছে।
এসব পেজের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও পেজ রয়েছে।
এ ছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশ, ডিআইজি-রংপুর রেঞ্জ এবং জেলা পর্যায়ের অন্তত ১৪টি পুলিশ কার্যালয়ের পেজ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দুটি তথ্যসূত্র ব্যবহার করেছে ডিসমিসল্যাব। এগুলো হলো মেটার নিজস্ব পার্টনার-পাবলিশার তালিকা এবং ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর মনেটাইজেশন আর্কাইভ।
নেদারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হোয়াট টু ফিক্স বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মনেটাইজেশন নীতি ও স্বচ্ছতার ওপর নজর রাখে।
অনুসন্ধান মতে, উল্লেখিত বাংলাদেশি পেজগুলো ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ফেসবুক থেকে আয় করছে।
বাংলাদেশ পুলিশের মূল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ প্রথম মনিটাইজেশন হয় ২০২২ সালের মার্চে। এরপর ২০২৩ সালে কয়েকটি জেলা পুলিশের পেজও এতে যুক্ত হয়।
২০২৫ সালে মেটা ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন, রিলসে বিজ্ঞাপন এবং পারফরম্যান্স বোনাস কর্মসূচিকে একীভূত করে বর্তমান ‘ফেসবুক কনটেন্ট মনিটাইজেশন’ কর্মসূচি চালু করে।
এর মাধ্যমে মনেটাইজেশন করা অ্যাকাউন্টগুলো ভিডিওর পাশাপাশি ছবি ও টেক্সট পোস্ট থেকেও আয় করার সুযোগ পায়।
হোয়াট টু ফিক্সের ডেটা বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব জানতে পারে, বাংলাদেশের ১১টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পেজ ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর মনিটাইজেশনে যুক্ত হয়।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর এতে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুলিশের মূল পেজ।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২২ আগস্ট মনেটাইজশনে যুক্ত হয় নড়াইল জেলা পুলিশের পেজ।
অনুসন্ধানে পাওয়া এসব তথ্য থেকে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে সরকারি পেজগুলো মনেটাইজেশনে যুক্ত হওয়ার অনুমতি পেল।
মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুক কনটেন্ট মনিটাইজেশন একটি আমন্ত্রণভিত্তিক কর্মসূচি। ফেসবুক অ্যাপ, ই-মেইল, মেটা বিজনেস স্যুট বা প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে ওই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠানো হয়। ব্যবহারকারীরাও কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ জানাতে পারেন, তবে এতে আমন্ত্রণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
শনাক্ত হওয়া ১৯টি পেজের মধ্যে মাত্র দুটি ‘পাবলিক ফিগার’ বা ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল।
বাকি ১৭টি পেজ নিজেদের সরকারি সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে স্পষ্টভাবে পরিচয় দিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়েকটি পেজকে মেটা বারবার মনিটাইজেশন কর্মসূচি থেকে সরিয়ে পরে আবার যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের মূল ফেসবুক পেজটির ২৭ লাখের বেশি ফলোয়ার আছে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে মেটার তিনটি মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে পেজটি একাধিকবার যুক্ত ও বাদ পড়েছে।
প্রথমবার ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার মাত্র ১০ দিন পর পেজটিকে সেখান থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে এটি কয়েকবার আবার যুক্ত হয়। ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এটি বর্তমান কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং ডিসমিসল্যাব তাদের বিশ্লেষণ করার সময়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের পেজের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। পেজটি মনিটাইজেশন থেকে বাদ পড়ার পর আবার যুক্ত হয়।
পেজটির দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা ডিসমিসল্যাবকে বলেন, বর্তমানে পেজটি আর মনিটাইজেশনে নেই। তবে ডিসমিসল্যাব বলছে, মেটার পার্টনার-পাবলিশার রেকর্ড ও হোয়াট টু ফিক্সের আর্কাইভ অনুযায়ী, পেজটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে আবার মনিটাইজেশনে যুক্ত হয় এবং তাদের অনুসন্ধান চলাকালে পেজটি কনটেন্ট থেকে আয় করছিল।
১৯টি সরকারি পেজে মনিটাইজেশন নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্যের জন্য মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ডিসমিসল্যাব। তবে ৩০ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত মেটা কোনো জবাব দেয়নি।


