ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ

রিজওয়ানা ও খলিলুরের জিজ্ঞাসাবাদ চায় জামায়াত

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন প্রভাবিত করে জামায়াতকে ‘মূলধারা’ থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এ দাবি জানান।

তাহের বলেন, সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যারা নারীদের উপযুক্ত অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, তাদের মূল শক্তি হিসেবে আসতে দেওয়া হয়নি। তাহেরের দাবি, এ বক্তব্যের মাধ্যমে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ কার্যত স্বীকার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে চাই—তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান সরকার কোনো যোগসাজশে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে কি না। ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি, প্রিসাইডিং অফিসারসহ—প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলকে জেতাতে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে।’

সরকারের কাছে রিজওয়ানা হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার আহ্বান জানান তিনি।

একইসঙ্গে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলেন তাহের। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার থাকলেও খলিলুর রহমান পরবর্তীতে দলীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন, যা পূর্বের অবস্থানের পরিপন্থী।

তাহের অভিযোগ করেন, ‘লন্ডন কন্সপিরেসি’ থেকে শুরু করে সরকারের ওপর প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সুবিধা করে দেওয়ার কাজ করেছেন খলিলুর রহমান। এ কারণেই তিনি মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, তার দাবি।

জামায়াতের এই নেতা সরকারের স্বচ্ছতার স্বার্থে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তাহের আরও বলেন, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিষয়ে জামায়াত আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করলেও পরে সেই নিরপেক্ষতার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সংস্কার ইস্যুতে আদালতে দায়ের করা রিট নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাহের। তার অভিযোগ, সরকারের ইন্ধনেই সংস্কার বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে এবং আদালতকে ব্যবহার করে জনমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের রায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে লড়াই ও জনমত গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।

সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে আশাবাদ জানান তাহের। তিনি বলেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সনদকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় জামায়াত বেশি ভোট পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেসব এলাকায় হামলা, বাড়িঘর পোড়ানো ও হুমকির ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাহের অভিযোগ করেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ শুরু হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অস্থির করার চেষ্টা চলছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহিংস পথে যাবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠু হলে জামায়াত সরকার গঠন করতে পারতো।

বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে জানিয়ে দলটির এই নেতা রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে এগোনোর আহ্বান জানান। তবে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ডেপুটি স্পিকার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার থাকার কথা। আর জুলাই সনদ অনুযায়ী একজন স্পিকার ও দুজন ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব রয়েছে—যাদের একজন সরকারি দল এবং অন্যজন বিরোধী দল থেকে থাকবে। সরকার লিখিত প্রস্তাব দিলে দলীয়ভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়ে তাহের বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিষয়ে জামায়াত শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে বলেও জানান তিনি।

বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সরকারকে এগোতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে শুল্ক কমানোর বিষয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিরোধী দলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির ও জাহিদুর রহমান।