‘সংসদে ফাইল ছোড়ার বিরোধী দল হবো না’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সংসদে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে জনগণের দাবি ও জাতীয় সমস্যা নিয়ে কার্যকর বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করার কথা বলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, সংসদে ফাইল ছোড়া, চেয়ার তুলে স্পিকারকে আক্রমণ বা কোনো ধরনের ‘আনসিভিলাইজড’ কর্মকাণ্ডে জড়াবে না জামায়াত।

সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদলের প্রস্তাব ও পরামর্শ উপেক্ষা করা হলে সংসদের বাইরে জনগণের কাছে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা ফাইল ছোড়ার বিরোধীদল হবো না। চেয়ার তুলে স্পিকার খুন করার বিরোধীদল আমরা হবো না। আনসিভিলাইজড কোনো কাজ আমরা এখানে করব না।’

আজ বুধবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন আল-ফালাহ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘ফাইল ছুড়লে, বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে হবে না। তখন আমাদের কী করার থাকে? তখন আমাদের করার থাকে জনগণের কাছে চলে আসা।’

জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদের ভেতর থেকেই সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা এবং বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির মতো বিষয় নিয়ে তারা একাধিকবার নোটিশ দিলেও সেগুলো আলোচনায় আনা হয়নি।

তার দাবি, এসব সমস্যা সমাধানে বিরোধীদলের টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়েও কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জামায়াত আমির বলেন, বিরোধীদল হিসেবে তারা সংসদে দায়িত্বশীল আচরণ করতে চান।

‘সরকারিদল হোক, বিরোধীদল হোক—সবাই বলেছেন, আমি শাসক নই, সেবক হতে চাই। তো এখন শাসকের মানসিকতা থাকবে কেন! সেবকের মানসিকতা থাকা উচিত,’ বলেন তিনি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। তার অভিযোগ, ‘অদৃশ্য চাপ’ থাকলে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন বলা যায় না।

‘সংসদে দাঁড়াইয়া সবাই বলে, সব সরকার বলে আসতেছে—সংবাদমাধ্যম স্বাধীন। বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন। এই দুইটার ব্যাপারে খুব স্বাধীন স্বাধীন শব্দ সব জায়গায় আমরা শুনি,’ বলেন তিনি।

‘অদৃশ্য চাপ যেখানে থাকে, সংবাদপত্র সেখানে স্বাধীন হয় কীভাবে,’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সাংবাদিকদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানেও অসঙ্গত আচরণ হলে তা প্রকাশ্যে আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো একটি হাউস তা না করলে অন্য কোনো হাউসকে বিষয়টি সামনে আনতে হবে।

‘সবগুলো আপনাদের বলা দরকার। আপনার হাউস, আপনি বলবেন না তো আরেক হাউস বলে দাও। কেউ না কেউ বলুক,’ যোগ করেন তিনি।

গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের অন্য তিন সাংবিধানিক স্তম্ভের ওপরও প্রভাবশালী একটি শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন জামায়াত আমির।

‘রাষ্ট্রের তিনটা সাংবিধানিক স্তম্ভ—লেজিসলেশন অর্থাৎ পার্লামেন্ট, এক্সিকিউটিভ নির্বাহী বিভাগ, জুডিশিয়ারি—এই তিনটা হচ্ছে স্বীকৃত সাংবিধানিক স্তম্ভ,’ তিনি বলেন।

‘সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত না, কিন্তু এই তিনটার চেয়ে পাওয়ারফুল মিডিয়া। এই মিডিয়া ঠিক থাকলে তিন প্লেয়ারের মেরুদণ্ড সোজা থাকবে। কিন্তু মিডিয়া যখন হাইড অ্যান্ড সিক্রেসি করবে, তখন মেরুদণ্ড সোজা থাকবে না,’ বলেন জামায়াত আমির।

‘এই ফোর্থ পিলারটা যদি থাকে দেশটা ভালো থাকবে রে ভাই। এই পিলারটা ভালো না থাকলে দেশের সব কিছু খারাপ হয়ে যাবে,” বলেন শফিকুর রহমান।

‘ফটোকার্ডে লেজ নাই, মাথা নাই’

সাক্ষাৎকারের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফটোকার্ডে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের অভিযোগও করেন তিনি।

‘আমি ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না। মিসলিড করা হয়, কাটপিস—লেজ নাই, মাথা নাই—মাঝখান থেকে শুধু পেট উঠাইয়ে দেওয়া হয়,’ বলেন তিনি।

এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয় মন্তব্য করে শফিকুর বলেন, কোনো ফটোকার্ড প্রকাশের পর সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ তার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানায়।

‘যদি আমরা এই নিশ্চয়তা পাই যে এগুলা হবে না, তাইলে কথা ইনশাল্লাহ বলবো এবং খুবই ভেহেমেন্টলি বলব। কিন্তু এই জায়গায় তো আমাদের রিজার্ভেশন আছে,’ বলেন তিনি।

সম্প্রতি জামায়াতের লংমার্চের সংবাদ কাভারেজ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তার দাবি, দ্বিতীয় লংমার্চে প্রথমটির চেয়ে মানুষের সমর্থন বেশি থাকলেও গণমাধ্যমে তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।

‘এত বড় কর্মসূচি হয়ে গেল, দেশ জাতির স্বার্থে—এটা তো আমাদের কোনো দলীয় এজেন্ডা না! মেহেরবানি করে আমাদেরকে আমাদের ডিউ শেয়ারটা দেন,’ তিনি বলেন।

তবে গণমাধ্যমের কাভারেজ জামায়াতের রাজনৈতিক ‘ক্রেডিট’ বাড়ানোর জন্য নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা ক্রেডিটের জন্য আন্দোলন করছি না। আমরা জনগণের অধিকার পাহারা দেওয়ার জন্য আন্দোলন করছি।’

সাংবাদিকদের ‘ফোর্থ পিলারের’ পাহারাদার আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত তাদের সঙ্গে মিলে ‘জাতির পাহারাদারি’ করতে চায়।

‘আপনারা এই দেশের নাগরিক। আপনারা ফোর্থ পিলারের এক একজন পাহারাদার, ভ্যানগার্ড। আমরা আপনাদের সাথেই জাতির পাহারাদারি করতে চাই,’ বলেন তিনি।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন সমস্যা লিখিতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

‘আপনাদের যদি কোনো অ্যাসোসিয়েশন থাকে তাহলে স্ট্রাকচারড ওয়েতে আপনারা আপনাদের সমস্যা এবং প্রস্তাবনাগুলো যদি একটু আমাদের হাতে দেন, তাইলে আমাদের পক্ষে আরও সুন্দরভাবে আপনাদের বিষয়গুলো নিয়ে মুভ করা সম্ভব হবে,’ তিনি বলেন।