৯ শ্রমিকের মৃত্যু: নতুন অতিথির অপেক্ষার ঘরে এখন আহাজারি

সিফায়াত উল্লাহ
সিফায়াত উল্লাহ

সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন পলাশ জলদাস। তার স্ত্রী ভূমিকা জলদাস সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর কিছুদিন পরই ঘরে আসবে নতুন অতিথি। কিন্তু পলাশের সেই অপেক্ষা অপূর্ণ থেকে গেল।

আজ শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিল নামে একটি কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইডে পলাশের (৩০) মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত আরও ১০ থেকে ১৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দুপুরে ভাটিয়ারীর জলদাসপাড়ায় পলাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যে ঘরে নতুন অতিথির অপেক্ষায় দিন কাটছিল, সেখানে এখন স্বজনদের আহাজারি।

পলাশের বাবা হরেন্দ্র জলদাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রায় ১০ মাস আগে পাশের মাদামবিবির হাট জেলেপাড়ার ভূমিকার সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে পলাশ ছিল সবার বড়।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে সংসার চালাত। আগে সাগরে মাছ ধরত। কিন্তু এখন মাছ ধরে সংসার চলে না। তাই ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে কাটার ম্যান হিসেবে কাজ করতো।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ইয়ার্ডে ছুটে যান পলাশের মা শোভা দাস ও তিন বোন। সেখানে তারা বিলাপ করছিলেন।

আজ সকালে ইয়ার্ডে একটি পুরোনো এলএনজি জাহাজ কাটার কাজ চলছিল। জাহাজের একটি অংশে তরল বর্জ্য দেখতে পেয়ে সেফটি অফিসারসহ কয়েকজন সেখানে যান বলে জানিয়েছেন ইয়ার্ডের ম্যানেজার মো. ইউসুফ জানান।

‘এরপরই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলে আরও কয়েকজন মারা যান’, বলেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি আগে এলএনজি বহন করত। এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য অংশ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করা জরুরি।

স্থানীয় মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি।

আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার বলেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুর্ঘটনার কথা জানতে পারেন তিনি। সকাল ১০টার দিকে ইয়ার্ডে গিয়ে গেট বন্ধ দেখতে পান।

তবে চিকিৎসা দিতে দেরি হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান ডেইলি স্টারকে বলেন, দুর্ঘটনার কারণ জানতে কাজ চলছে।

এদিকে, আজ বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিকদের দেখতে যান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।