চট্টগ্রামে নালার ওপর সড়কবাতি, জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির শঙ্কা
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় সচল নালা ও সড়কের ওপর সরাসরি এলইডি সড়কবাতির খুঁটির বেজ নির্মাণ করায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, এতে জলাবদ্ধতা ও যান চলাচলের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।
তীব্র সমালোচনার মুখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
চসিক সূত্র জানায়, যেসব এলাকায় নালার ওপর খুঁটির বেজ নির্মাণ করা হয়েছে, সেসব স্থানে খুঁটির অবস্থান পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
কমিটির সদস্যসচিব ও চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারহাদুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নালার পানিপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রকল্পের কিছু স্থানে খুঁটির অবস্থান পরিবর্তন করা হবে।’
লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রকল্পের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়কে মোট ৪৭৮টি খুঁটি ও এলইডি বাতি স্থাপন করা হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। জামালখান, চেরাগী পাহাড়, নন্দনকানন, কাজীর দেউড়ি, মুরাদপুর ও আসকার দিঘির পূর্ব পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি খুঁটির বেজ নির্মাণ করা হয়েছে।
জামালখানে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে একটি সচল নালার ওপর নির্মিত বেজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জামালখান, আসকার দিঘির পাড় ও নন্দনকাননসহ বিভিন্ন স্থানে নালার ওপর বেজ নির্মাণ করা হয়েছে। নন্দনকাননে ডিসি হিলের সামনে অন্তত ছয়টি খুঁটির বেজ সরাসরি নালার ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নালার ওপর স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলে সেখানে আবর্জনা আটকে যাবে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ছাড়া, সড়কের কিছু অংশে বেজ নির্মাণ করায় চলাচলের জায়গা কমে যাচ্ছে, এতে পথচারী ও চালক উভয়ের জন্যই সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
জামালখানের বাসিন্দা রেশমি আখতার বলেন, ‘রাতে নিরাপদে চলাচলের জন্য সড়কবাতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেগুলো যদি নালার পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতার কারণ হয়, তাহলে নগরবাসীর দুর্ভোগ কেবল বাড়বে।’
নন্দনকাননের বাসিন্দা সুশান্ত বড়ুয়াও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘স্কুলের ঠিক সামনে খুঁটি স্থাপন করে সড়কের জায়গা কমিয়ে দিলে যানবাহন ও পথচারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। নালার পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে বর্ষাকালের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
নালার ওপর খুঁটি স্থাপনের আগে যথাযথ পরিকল্পনা ছিল কি না, জানতে চাইলে চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই কিছু ত্রুটি ছিল, যে কারণে সমালোচনা হচ্ছে। এখন ত্রুটি সংশোধনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান বলেন, ‘কাজ বাস্তবায়নের সময় দেখা গেছে, কিছু খুঁটি নালার ওপর পড়েছে। সেগুলো সরিয়ে ঠিক করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু এলাকা থেকে আমরা অভিযোগ পেয়েছি এবং আমি নিজে সেসব স্থান পরিদর্শন করেছি। যেসব স্থানে ঝুঁকি আছে বলে মনে হয়েছে, সেখানে আমরা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রেখেছি। বৈদ্যুতিক ও সিভিল প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যেসব স্থানে খুঁটি ঝুঁকি তৈরি করছে বা পানিপ্রবাহে বাধা দিচ্ছে, সেখান থেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হবে।’
সমস্যা প্রশমনে জামালখান ও নন্দনকাননে নালার পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বাইপাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারহাদুল আলম। তিনি বলেন, ‘পানিপ্রবাহ নির্বিঘ্ন রাখতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বড় আকারের ভূগর্ভস্থ পাইপ স্থাপন করা হবে।’
বন্দরনগরীতে ফুটপাত, সড়ক ও নালার ওপর ইউটিলিটি খুঁটি স্থাপন নতুন কোনো ঘটনা নয়। নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘প্রায় এক দশক আগেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন জনসাধারণের অভিযোগের পর বেশ কয়েকটি খুঁটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণত ঠিকাদাররা এসব খুঁটি বসান। কিন্তু চসিকের যথাযথ তদারকি থাকা উচিত।’
আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের অভাবকে সমস্যাটির কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নালা ও পানিপ্রবাহের বিষয়গুলো সাধারণত সিভিল বিভাগের আওতাধীন। কিন্তু বৈদ্যুতিক বিভাগের কর্মীরা অনেক সময় অন্যান্য অবকাঠামোর বিষয় বিবেচনা না করে শুধু নিজেদের নির্দিষ্ট কাজ শেষ করে। এই মানসিকতার কারণেই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।’
নিম্নমানের কাজ ও নকশাগত ত্রুটি এড়াতে যেকোনো ইউটিলিটি খুঁটি স্থাপনের আগে প্রতিটি স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করে নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন তিনি।