শিশুদের জন্য আর কোনো দেশ নেই
রামিসার বাবার একটি কথা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে। তিনি বলেছেন, তিনি তার মেয়ের হত্যার বিচার চান না। কারণ তিনি জানেন, এই দেশে বিচার পাওয়া এক ধরনের বিলাসিতা।
একজন বাবা কতটা অসহায় হলে নিজের সাত বছরের মেয়ের এমন করুণ মৃত্যুর পরও বিচার ব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখতে পারেন না!
এই একটি বাক্যই আসলে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ আর বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি।
রামিসার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মন্তব্যগুলো পড়ার পর থেকে ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। শুধু ঘটনাটা না, বরং ঘটনাটির পর মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও বেশি ভয়ংকর লাগছে।
একটা শিশুকে ঘিরে যেখানে শোক, সহানুভূতি আর মানবিকতা থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ হাসাহাসি, বানানো গল্প, আর অসুস্থ বিনোদন। যেন একটা শিশুর জীবনও এখন মানুষের কাছে ‘কনটেন্ট’ ছাড়া আর কিছুই না।
আমরা প্রায়ই বলি যে সমাজ দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অসুস্থতা হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে? সহজ উত্তর হলো, না। বছরের পর বছর ধরে অনলাইনে ঘৃণা, নারীবিদ্বেষ, অশ্লীলতা আর নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ফল আজ আমরা দেখছি।
এখন মানুষ ট্র্যাজেডির মধ্যেও ভাইরাল হওয়ার সুযোগ খোঁজে। একটা শিশুর মৃত্যুতেও তারা ‘রিঅ্যাকশন’, ‘এনগেজমেন্ট’ আর সস্তা বিনোদনের উপাদান খুঁজে পায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এসব মানুষ আমাদের আশেপাশেই থাকে। তারা কোনো দূরের দানব না। তারা আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টে আছে, আমাদের কমেন্ট সেকশনে আছে, আমাদের সমাজেই আছে। আর যখন একটা সমাজ ধীরে ধীরে সহানুভূতি হারাতে শুরু করে, তখন সেখানে শুধু অপরাধীই ভয়ংকর না, সেই অপরাধকে ঘিরে মানুষের বিকৃত প্রতিক্রিয়াও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
এ দেশের প্রত্যেকটি পরিবার—যাদের ঘরে কন্যা শিশু আছে—আতঙ্কে দিন পার করছে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা হয়তো দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে, ছাড়ছে। এটা করেছে কেবল সন্তানদের নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার জন্য। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা মেয়েদের চলাফেরা সীমিত করছে ভয় থেকে। কারণ, তারা বুঝতে পারছে, এখানে শুধু বাস্তব জীবনই অনিরাপদ না, অনলাইন জগতও ভয়াবহভাবে অসুস্থ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে একটা শিশুকেও যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তার শরীরকেও ভোগ্যপণ্য করে তোলা হচ্ছে। তার পরিচয়, তার মর্যাদা, তার প্রতি ন্যূনতম মানবিকতাও মানুষ রক্ষা করতে চায় না। বরং তাকে নিয়েও অশ্লীলতা আর বিকৃত রসিকতা শুরু হয়ে যায়।
একটা সমাজ তখনই সত্যিকারের বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখন একটা শিশুর ট্র্যাজেডিও মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পারে না, তখন বুঝতে হবে সমস্যা শুধু কিছু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমস্যা আমাদের সামষ্টিক মানসিকতার ভেতরেও ঢুকে গেছে।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কত রামিসা হারালে এ দেশ শিশুদের জন্য নিরাপদ হবে? কখনো কখনো সত্যিই মনে হয়, শিশুদের জন্য আর কোনো দেশ নেই।
মো. আব্বাস: দ্য ডেইলি স্টারের সাবেক সংবাদকর্মী। বর্তমানে কাজ করছেন করপোরেট কমিউনিকেশন খাতে।
abdulla180395@gmail.com