তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

আইফোনের জন্য জীবন? অপ্রতিমের ঘটনায় সামনে আসছে যে প্রশ্নগুলো

আহমেদ দীপ্ত
আহমেদ দীপ্ত

মায়ের আইফোন সঙ্গে নিয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হয় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। আজ দুপুরে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল।

কেন অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশ এখনো তা নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে পুলিশ ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটির কারণে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আইফোনটির সন্ধান এখনো মেলেনি।

অপ্রতিমকে খুঁজে না পেয়ে তারা বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তাকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তার আবেদন জানান মা। রাতভর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ। সবশেষ আজ বিকেলে তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধানের সমাপ্তি ঘটে।

আমরা ঠিক কেমন সমাজ বা সময়ে বসবাস করছি, যেখানে সামান্য কোনো একটি জিনিস—ফোন, কয়েক হাজার টাকা কিংবা অন্য কিছু—এতটাই মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে যে, সেটির জন্য একজনের জীবনও কেড়ে নেওয়া সম্ভব?

প্রায় প্রতিদিনই আমরা ছিনতাই, ডাকাতি ও লুটের খবর পড়ি। কখনো লক্ষ্য থাকে একটি ফোন, কখনো একটি ব্যাগ কিংবা নগদ কিছু টাকা। পাঠক হয়তো নতুন নতুন ঘটনা পড়তে পড়তে পুরোনোটি ভুলে যাচ্ছেন। কিন্তু যিনি হামলার শিকার হন কিংবা যে পরিবারটি স্বজন হারায়, তাদের কাছে এসবের কিছুই স্বাভাবিক নয়। এই একটি ঘটনাই হয়তো বদলে দেয় তাদের জীবন। হয়তো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একটি পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন।

অপ্রতিমকে হত্যার কারণ হিসেবে যে বিষয়টি ভাবা হচ্ছে, শেষমেশ যদি সেই সন্দেহটিই সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে আবারও সামনে আসবে কিছু প্রশ্ন। বিষয়টি কি শুধু লোভের? কীসের লোভ? সামান্য একটি ফোন, যা চাইলেই বদলে ফেলা যায়? সম্পদের প্রতি এই লোভ যে কত সহজেই প্রাণঘাতী সহিংসতার রূপ নিতে পারে—তাই হয়তো আবারও আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। সামনে আসবে আরও একটি প্রশ্ন—বাসার বাইরে বেরোলে আমরা আসলে কতটা নিরাপদ? কিংবা আদৌ কি নিরাপদ?

অপ্রতিমের এই ঘটনাটি আমাদের ব্যস্ত জীবনে হয়তো আরও একটি শিরোনামের মতোই। আমরা খবরটি পড়ব, বিস্মিত হবো, আমাদেরও খারাপ লাগবে...তারপর আমরা হয়তো অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। কিন্তু, তার বাবা-মায়ের কী হবে? এই শোক তারা কীভাবে কাটাবে? তাদের সন্তানের জীবনের আলো তো চিরতরে নিভে গেল! এই এক ঘটনা তো চিরতরে বদলে দিলো তাদের জীবন।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, অপ্রতিমের ঘটনা তা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ২৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১০ জনই ছিল ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী। ৩৬টি ঘটনায় আগে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মরদেহ পরে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটেছে এবং এগুলোর সঙ্গে অপ্রতিমের ঘটনাকে এক করে দেখা উচিত নয়। তবে সংখ্যাগুলো উপেক্ষা করা কঠিন। কারণ এগুলো কেবল সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবারের যন্ত্রণা, বাবা-মায়ের হাহাকার।

অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের কঠিন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার মতো সাধারণ একটি কাজে বাড়ি থেকে বের হলে শিশুরা কতটা নিরাপদ? আর রাস্তায় ফোন, মানিব্যাগ বা ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করার সময় আমরা নিজেদের কতটা নিরাপদ মনে করি?

জনজীবন থেকে সব ধরনের ঝুঁকি দূর করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সাধারণ কোনো একটি জিনিস সঙ্গে থাকার কারণে মানুষকে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা মেনে নিতে হবে—এমনটা হওয়া উচিত নয়। অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শনাক্ত করে হত্যার কারণ উদঘাটন করতে হবে পুলিশকে। এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে যেন—ছিনতাই, লুটসহ এ ধরনের অপরাধ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে না ওঠে।

কোনো সম্পদের মূল্য কখনোই একটি মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি হতে পারে না। কিন্তু এ কথা বলা সহজ। কঠিন কাজ হলো এমন একটি পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, যেখানে মানুষকে তাদের পাড়া-মহল্লা, শহর ও ক্যাম্পাসে চলাফেরার সময় এ ধরনের সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে হবে না।

অপ্রতিমের বয়স ছিল ১৩ বছর। সে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। তদন্তে তার হত্যার কারণ সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত যা-ই উঠে আসুক, এই বিষয়টিই ঘটনার কেন্দ্রে থাকা উচিত।

একটি ফোন যেকোনো সময়, যেকোনো কারণেই বদলে নেওয়া যায়। একটি জীবন নয়!

অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে যে সন্দেহ, তা সত্যি প্রমাণিত হলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় এটি হবে না যে, একটি আইফোন চুরি হয়েছিল। বরং সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হবে, কেউ হয়তো একটি কিশোরের জীবনের চেয়েও ওই ফোনটিকে মূল্যবান মনে করেছিল।