বিসিবির আরেকটি নির্বাচন, সেই চেনা ছবি

সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান

গত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নির্বাচনের আট মাস পর, দেশের ক্রিকেটের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আজ আবার পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন করতে যাচ্ছে। তবে প্রশাসন পরিবর্তন হলেও পুরো চিত্রটি অনেকটাই আগের মতোই রয়ে গেছে, ফলে এবারও নির্বাচন পরিণত হয়েছে আরেকটি অতিমাত্রায় অনুমানযোগ্য এবং উত্তেজনাহীন প্রতিযোগিতায়।

২৩টি পরিচালক পদের মধ্যে আটটি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

ভোট হবে মাত্র দুটি উপ-ক্যাটাগরিতে—ক্যাটাগরি-১ (খুলনা ও বরিশাল), যেখানে তিনটি পদের জন্য পাঁচজন প্রার্থী লড়ছেন, এবং ক্যাটাগরি-৩, যেখানে ১২টি ক্লাব প্রতিনিধি পদের জন্য ১৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমান অ্যাডহক কমিটির প্রধান ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালই চার বছরের জন্য সভাপতি হতে যাছেন। ক্লাব ক্যাটাগরির ১৬ প্রতিদ্বন্দ্বির মধ্যে কোন ১২ জন নির্বাচিত হবেন তাও অনুমেয়।  

গত বছরের ৬ অক্টোবর এক বিতর্কিত নির্বাচনে সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার নেতৃত্বাধীন বোর্ড মাত্র দুই মাসের মতো টিকে ছিল।

সরকার পরিবর্তনের পর, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এনএসসি গত ৭ এপ্রিল আমিনুল নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেয় এবং তামিমের নেতৃত্বে একটি ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে।

নিয়মিত ক্রিকেট কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এই কমিটিকে আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে একটি নতুন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। শুরু থেকেই কমিটি নির্বাচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল এবং নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস আগেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ করেছে। তবে সমালোচকরা মনে করেন, দায়িত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যাপারটাই এখানে অনুপস্থিত। 

আগের বোর্ডের মতোই, এই অ্যাডহক কমিটির বিরুদ্ধেও নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধিদের এনে কাউন্সিলরশিপ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত রাখার বারবার দাবি সত্ত্বেও ক্রিকেট প্রশাসনে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিকীকরণের উদ্বেগ আবার ফিরিয়ে এনেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই অ্যাডহক কমিটি গঠিত হয়েছিল, তাদের দেওয়া মূল সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে এই কমিটি খুব একটা নজর দেয়নি। সেই সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল বোর্ডের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন সুশাসন শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রযুক্তিগত দিক উন্নত করা।

প্রকৃতপক্ষে, বিসিবির গঠনতন্ত্রই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি করে দেয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার আহসানুল করিম 'দ্য ডেইলি স্টার'কে বলেন, ‘আমি মনে করি পুরো গঠনতন্ত্রটি সংশোধন করা দরকার। এটি দীর্ঘ সময় ধরে এভাবেই তৈরি হয়ে আছে।’ তিনি ইঙ্গিত দেন যে এখানে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

আহসানুল ই-ভোটিং ব্যবস্থা নিয়েও তার আপত্তির কথা জানান।

আগের নির্বাচনগুলোর মতোই, ৩৯ জন ক্লাব ক্যাটাগরির ভোটারসহ মোট ৪২ জন ভোটার এবারও ইন্টারনেটের মাধ্যমে (ই-ভোটিং) তাদের ভোট দেবেন। এই প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ক্রমাগত সমালোচনার শিকার হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি ই-ভোটিং পছন্দ করি না, তবে অনেকে এর অনুরোধ করেছেন কারণ গঠনতন্ত্রে এর অনুমতি রয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, অনেক ভোটার দেশের বাইরে আছেন বা তাদের পক্ষে ঢাকায় আসা কঠিন।’

এদিকে, বিসিবির সাবেক পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম যুক্তি দেখিয়েছেন, মেধাকে যদি প্রধান বিবেচনা হিসেবে রাখা হয়, তবে রাজনৈতিকীকরণ সব সময় ক্ষতিকারক নয়, ‘রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে আমরা ওডিআই বা টেস্ট স্ট্যাটাসের মতো অর্জন পেতাম না বা সরকারি সহযোগিতাও পেতাম না।’

তার মতে, ‘ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য প্রক্রিয়াটি নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করার চেষ্টাই মূলত এই ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।’

বিসিবির একটি বড় সংখ্যক কাউন্সিলর বর্তমান রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার আত্মীয়স্বজনও এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা এই ধারণাকে আরও উসকে দিচ্ছে যে ক্রিকেটীয় যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগই এই পদগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

তা ছাড়া, ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির সাতজন সদস্য নিজেই পরিচালক পদের জন্য লড়ছেন, যার মধ্যে মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ইতিমধ্যেই চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এই নির্বাচনকে একটি নতুন সূচনা হিসেবে মনে হচ্ছে না, বরং এটি নতুন মোড়কে বিসিবির আরেকটি চেনা নির্বাচন, যেখানে অনেক পুরোনো সমস্যাই রয়ে গেছে অমীমাংসিত।