পরিবার-বন্ধুর বার্তায় জানলেন বাদ পড়েছেন, পাকিস্তান দলে ‘চরম বিশৃঙ্খলা’

স্পোর্টস ডেস্ক

পাকিস্তান ক্রিকেটে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। তবে ইংল্যান্ড সফরে এবার যা ঘটেছে, সেটিকে বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত রূপ বললেও কম বলা হয়। দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় এবং দুই কোচকে সিরিজের মাঝপথে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই শুধু চমকে দেওয়ার মতো নয়, আরও অবাক করার বিষয়। এমনকি দলে থাকা ক্রিকেটাররাই নাকি আগে থেকে কিছু জানতেন না। লন্ডনে ছুটির দিনে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের পাঠানো বার্তা পেয়েই জানতে পারেন, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তে তারা আর দলের অংশ নন।

ঘটনার সূত্রপাত লর্ডসে ইংল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের ১৯৪ রানের বিশাল পরাজয়ের পর। ওই হারে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে খুইয়ে ফেলে পাকিস্তান। চলতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এটি ছিল তাদের ষষ্ঠ হার। আট ম্যাচে মাত্র দুই জয় নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে থাকা দলটির ভেতরের অস্থিরতা এরপরই প্রকাশ্যে চলে আসে।

সোমবার সন্ধ্যায় এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে সাত ক্রিকেটারকে স্কোয়াড থেকে সরিয়ে দেয় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। তারা হলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইমাম-উল-হক, সালমান আগা, আলি উসমান, আমের জামাল, আওয়াইস জাফর ও খুররম শাহজাদ। তাদের জায়গায় দলে নেওয়া হয়েছে সাইম আইয়ুব, আবদুল্লাহ ফজলসহ পাঁচজন নতুন মুখকে।

শুধু ক্রিকেটার নয়, তৃতীয় টেস্টের আগেই প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া তৃতীয় টেস্টে পাকিস্তানের দায়িত্ব নিতে সাদা বলের দলের কোচ মাইক হেসন ও অ্যাশলি নফকেকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে।

তবে সিদ্ধান্তের ধরনই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদ পড়া সাত ক্রিকেটারের অনেকেই সোমবার বিকেল পর্যন্ত নিজেদের ভাগ্য সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। লন্ডনে ছুটির দিন কাটাতে বের হওয়া কয়েকজন এবং দলের হোটেলে থাকা অন্যরা বিকেল ৫টার দিকে বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে বার্তা পেতে শুরু করেন, ‘কী হচ্ছে, তোমরা কি কিছু জানো?’

প্রথমে বিষয়টি বুঝতেই পারেননি তারা। পরে পরিবার ও বন্ধুদের পাঠানো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে জানতে পারেন, তারা আর দলের অংশ নন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'খেলোয়াড়েরা আগে থেকেই কিছু জানতেন না। দলের ব্যবস্থাপনা তাদের আগেভাগে কিছু জানায়নি।'

অতীতে পাকিস্তান ক্রিকেটে বড় ধরনের পরিবর্তন কম হয়নি। কিন্তু চলমান সিরিজের মাঝপথে এভাবে একসঙ্গে সাত ক্রিকেটার ও দুই কোচকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে একেবারে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি হলো, বাদ পড়া সাতজনের মধ্যে আমের জামাল ও আওয়াইস জাফর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের কোনো ম্যাচেই খেলেননি। অথচ মাত্র এক মাস আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড সফরের জন্য টেস্ট দলে ফিরেছিলেন জামাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাউরোবায় প্রথম টেস্টে দুজনই খেলেছিলেন। জাফরের সেটিই ছিল টেস্ট অভিষেক।

আলি উসমানকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তও কম বিস্ময়কর নয়। হেডিংলিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট নেওয়া এই স্পিনার ওই মাঠে ১৯৭২ সালের পর কোনো সফরকারী স্পিনার হিসেবে প্রথমবার এমন কীর্তি গড়েছিলেন। সেই পারফরম্যান্সের পরও সিরিজের মাঝপথে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরে বেশ কিছুদিন ধরেই পরিবর্তনের গুঞ্জন চলছিল। কিন্তু সেই গুঞ্জন খুব দ্রুতই ‘পুরোপুরি বিশৃঙ্খলায়’ রূপ নেয়। সিদ্ধান্তের ব্যাপ্তি খেলোয়াড়, সমর্থক এবং পাকিস্তান ক্রিকেটের পর্যবেক্ষকদেরও হতবাক করেছে। অনেকেই এটিকে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের হতাশা বেশ কিছুদিন ধরেই জমছিল। সিরিজের মাঠের এবং মাঠের বাইরের ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত বোর্ডকে এমন এক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, যা খেলোয়াড়দের পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দেয়।'

এর পেছনে খেলোয়াড়দের সঙ্গে বোর্ডের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইংল্যান্ড সফর যত এগিয়েছে, সেই সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুই বড় পরাজয়ের পর পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় এবং বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার বোর্ডের তোপের মুখে পড়েন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ইমাম-উল-হক। দ্বিতীয় টেস্টে চোটের কারণে দুই ইনিংসেই ব্যাট করতে না পারার পর তার চোট নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এমনকি চোটটি সাজানো ছিল কি না, তা নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। অতীতেও ২০২২ সালের মুলতান টেস্ট এবং ২০২৫ সালের নিউজিল্যান্ড সফরে ইমাম চোটের অজুহাত দিয়েছিলেন, এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড।

রিজওয়ানও বোর্ডের অসন্তোষের বাইরে নন। ড্রেসিংরুমে তার প্রভাব নিয়ে বোর্ডের মধ্যে অসন্তুষ্টি রয়েছে বলে জানা গেছে। বোর্ডের একটি অংশ মনে করছে, দলের ভেতরে তার উপস্থিতি কখনো কখনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তার ব্যাটিং পারফরম্যান্সও পরিস্থিতি সহজ করেনি। ইংল্যান্ডে চার ইনিংসে মাত্র ৬২ রান করেছেন তিনি। আর গত চার বছরে টেস্ট ক্রিকেটে তার শতক মাত্র একটি।