কাবরেরা যুগের ব্যবচ্ছেদ: দীর্ঘ মেয়াদ, তবে প্রাপ্তি সামান্যই

আনিসুর রহমান
আনিসুর রহমান

আগামী ৩০ এপ্রিল হাভিয়ের কাবরেরার চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হিসেবে বিদায়বেলায় এই স্প্যানিয়ার্ড রেখে যাচ্ছেন ঐতিহাসিক দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের এক রেকর্ড, তবে সেই সাথে মিশ্র ফলাফলের আক্ষেপও। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিদেশি কোচ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার এই সময়কাল নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েই গেছে।

এমন একটা সময়ে যখন বাংলাদেশের কোচরা কয়েক মাসও টিকতে পারতেন না, সেখানে কাবরেরা গত চার বছরে ৩৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দলের ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা, যা এক ধরনের স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়। এই ৩৯ ম্যাচে জয় এসেছে মাত্র ১০টিতে। এর মধ্যে বেশিরভাগ জয়ই এসেছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ ভুটান (৩), কম্বোডিয়া (২), সেশেলস (১) এবং মালদ্বীপের (৩) বিপক্ষে। তবে এর মাঝেই ভারতের বিপক্ষে ১-০ গোলের একটি অবিস্মরণীয় জয় ছিল, যা দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল।

মাঠের ফলাফল যদি চিন্তার কারণ হয়ে থাকে, তবে দলে হাই-প্রোফাইল খেলোয়াড়দের আগমনে প্রত্যাশার পারদ কেবল ঊর্ধ্বমুখীই হয়েছে। লিস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী, কানাডা প্রবাসী শমিত সোম, ইতালি প্রবাসী ফাহামেদুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জায়ান আহমেদকে নিয়ে কাবরেরার হাতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সেরা একটি স্কোয়াড ছিল। তবুও, ১৯৮০ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ এএফসি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়। চার দলের গ্রুপে ছয় ম্যাচ থেকে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় তৃতীয় স্থান পেয়ে।

খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মান বাড়লেও দলের নির্দিষ্ট কোনো খেলার ধরন বা পরিচয় গড়ে ওঠেনি। হামজা ও শমিতের মতো মানসম্পন্ন মিডফিল্ডারের পাশাপাশি রাকিব হোসেন, ফাহামেদুল এবং ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের মতো উইঙ্গারদের গতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও দলগতভাবে একটি শক্তিশালী আক্রমণভাগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। কাবরেরার খেলার কৌশল বারবারই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ম্যাচের মাঝপথে বদলি খেলোয়াড় নামানোর ক্ষেত্রে তার ধীরগতি এবং পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা অনেককেই হতাশ করেছে।

দলে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল স্পষ্ট। ২০২১ সালের শেষের দিকে পূর্বসূরি জেমি ডে'র বিদায়ের পর ৩০ জনেরও বেশি খেলোয়াড়কে পরখ করে দেখার পরও কাবরেরা একটি স্থায়ী দল গঠন করতে ব্যর্থ হন। তপু বর্মন, সাদ উদ্দিন, বিশ্বনাথ ঘোষ, সোহেল রানা, রহমত মিয়া, রাকিব, মোহাম্মদ হৃদয় এবং মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাই দলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। পাশাপাশি শেখ মোরসালিন, মেহেদী হাসান শ্রাবণ, মিতুল মারমা, শাহরিয়ার ইমন এবং শাকিল আহাদ তপুর মতো কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় প্রবাসী ফুটবলারদের সাথে দলে নিজেদের জায়গা পাকা করেছেন।

রক্ষণের দুর্বলতা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ৪১ বছর বয়সী এই কোচ একটি নির্ভরযোগ্য রক্ষণভাগ তৈরি করতে রীতিমতো সংগ্রাম করেছেন। বিশেষ করে ইনজুরির সংকটে তিনি প্রায়ই ফুটবলারদের তাদের নিয়মিত পজিশনের বাইরে খেলাতেন। এই অস্থিতিশীলতার মাশুলও দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে; তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচগুলোতে শেষ মুহূর্তের ভুলের কারণে অনেক পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছে।

আক্রমণভাগের সমস্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রাইকার হিসেবে আমিনুর রহমান সজীব, সাজ্জাদ হোসেন, সুমন রেজা, আরমান আকাশ ফয়সাল, আল আমিন, পিয়াস আহমেদ নোভা এবং মিরাজুল ইসলামকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানো হলেও গোলের খরা কাটেনি। ধারাবাহিকতাহীন খেলোয়াড় নির্বাচনের কারণে দলের আক্রমণভাগের ধার অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

কাবরেরার কৌশলগত পরিবর্তনগুলো এই অনিশ্চয়তাকে আরও প্রকট করে তোলে। ২০২২ সালের এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে 'হাই-ইনটেনসিটি প্রেসিং' ফুটবল থেকে সরে এসে তিনি 'বিল্ড-আপ প্লে' এবং বল পজিশন ধরে রাখার দিকে মনোযোগ দেন। এই কৌশলের সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০২৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে, যেখানে বাংলাদেশ দীর্ঘ ১৪ বছর পর সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়, যা তার এই উত্থান-পতনের মেয়াদের অন্যতম সেরা একটি অর্জন।

দিনশেষে, কাবরেরার অধীনে বাংলাদেশ দল একটি সুনির্দিষ্ট দলগত কাঠামোর চেয়ে বরং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক সামর্থ্য এবং অভিজ্ঞতার সাথে তার এই কৌশল কতটা মানানসই, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। সম্ভাবনাময় একটি দল নিয়ে ধারাবাহিক সাফল্য এনে দিতে না পারা, বিশেষ করে ২০২৭ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব পার হতে না পারা, যা অনেকেই সম্ভব বলে মনে করেছিলেন, তার এই মেয়াদকে অনেকটা আক্ষেপের প্রহর বানিয়ে দিয়েছে।

তিনি যখন দায়িত্ব নেন, তখন ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮৬। সময়ের পরিক্রমায় তা ১৯২-তে নেমে যায়, এরপর আবার ১৮০-তে ওঠে এবং বর্তমানে দলটির র‌্যাঙ্কিং ১৮১।

কাবরেরা একটি বিষয় অন্তত প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, বাংলাদেশ এশিয়ান পর্যায়ে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে। কিন্তু তিনি যা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা হলো, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় মুহূর্তগুলোতে দল হিসেবে জয় ছিনিয়ে আনার সক্ষমতা তাদের আছে কিনা।