ইস্ট বেঙ্গল: সীমান্ত ছাড়ানো স্মৃতি আর বাঁধভাঙা আবেগ
কলকাতার ময়দানে আরিয়ান ক্লাব আর ম্যাসিওর্স ক্লাবের মাঝের বিশাল বট আর অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় অনুশীলন করছিলেন তরুণ ফুটবলাররা। কাছেই লাল-হলুদ জার্সি পরা সমর্থকদের স্রোত—কেউ একা, কেউ আবার বন্ধু বা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে—এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঐতিহাসিক ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব তাঁবুর (টেন্ট) দিকে। সবার চোখে-মুখে একটাই আকুলতা, ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (আইএসএল) সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি একবার চোখের দেখা দেখা, যা দীর্ঘদিন ধরে ক্লাবটির হাতছানি এড়িয়ে গেছে।
গোয়ায় সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ কাভার করার পথে গতকাল কলকাতায় একটু যাত্রাবিরতি দিতে হয়েছিল এই প্রতিবেদককে। ঠিক তখনই ইস্ট বেঙ্গল এফসির এই বাঁধভাঙা উদযাপনে শামিল হওয়া। গত ২১ মে কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গন স্টেডিয়ামে ইন্টার কাশির বিরুদ্ধে ২-১ গোলের ব্যবধানে জিতে ভারতের শীর্ষ স্তরের লিগ শিরোপার খরা কাটিয়েছে তারা; অবসান ঘটেছে দীর্ঘ ২২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার।
ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, সমর্থকরা কেউ ট্রফির সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত, কেউ আবার ট্রফিটি একটু ছুঁয়ে দেখতে ব্যাকুল। তবে প্রবীণ কর্মী বিশ্বজিৎ মজুমদার তাদের সামলাতে সামলাতে বলছিলেন, ‘ছুঁবেন না! দয়া করে কেউ ট্রফিটা ছুঁবেন না!’
কলকাতা ফুটবল লিগে ৪১টি শিরোপা নিয়ে রাজত্ব করা ইস্ট বেঙ্গল পেশাদার আই-লিগ আমল থেকে জিতেছে ১৭টি ট্রফি। কিন্তু ভারতের শীর্ষ ফুটবল লিগের মুকুটটি এই মৌসুমের আগপর্যন্ত তাদের অধরাই থেকে গিয়েছিল। তাই এই জয় শুধু কলকাতার বুকেই না, ক্লাবটির বিশাল সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তির কারণে সীমান্তের ওপারেও এক অন্যরকম আবেগের জন্ম দিয়েছে।
১৯২০ সালে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ (যা এখন বাংলাদেশ) থেকে আসা মানুষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবের সঙ্গে বাংলাদেশের নাড়ির টান অনেক গভীর। মোনেম মুন্না, রিজভী করিম রুমি, শেখ মোহাম্মদ আসলাম আর গোলাম গাউসের মতো বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলাররা একসময় মাঠ কাঁপিয়েছেন এই ইস্ট বেঙ্গলের হয়েই। ১৯৯১ সালে ক্লাবটির কলকাতা ফুটবল লিগ জয়ে এই তারকারা রেখেছিলেন অসামান্য অবদান।
দুই পারের ফুটবলের এই মেলবন্ধন এখনো কোচ আর খেলোয়াড়দের আদান-প্রদানে স্পষ্ট। স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজোন, যিনি এর আগে বাংলাদেশের জায়ান্ট বসুন্ধরা কিংসকে টানা চারবার লিগ শিরোপা জিতিয়েছেন, এবং ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার মিগুয়েল ফিগেইরা ছিলেন কিংসদের সেই অপরাজেয় দলের মূল শক্তি।
‘ইস্ট বেঙ্গলকে ভালোবাসা তো আমাদের রক্তে’, বলছিলেন সমর্থক সুব্র সাহা, যার দাদা ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে স্থায়ী হয়েছিলেন।
তিনি আরও বললেন, ‘অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না, কারণ আমরা ২২টা বছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছি। আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান আগেই এই ট্রফি জিতেছিল, তাই আমাদের ক্ষুধাটা ছিল আরও বেশি। ফাইনালের আগের পরিবেশটা ছিল অবিশ্বাস্য—অপরিচিত মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, আবির খেলছে, সবাই মিলে একসঙ্গে আনন্দ করছে। এই স্মৃতি সমর্থকরা সারাজীবন মনে রাখবেন।’
আরেক সমর্থক বাবাই চক্রবর্তীর মতে, এটা ছিল ‘২২ বছর ২২ দিনের’ এক অপেক্ষার অবসান। তিনি বললেন, ‘আমরা কিন্তু কখনো বিশ্বাস হারাইনি।’
ক্লাবের মিডিয়া ম্যানেজার পারিজাত মৈত্র জানান, ইন্টার কাশির বিরুদ্ধে সেই ভাগ্যনির্ধারক ম্যাচের সময় অনুশীলনের মাঠে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার সমর্থকের জন্য দুটি বিশাল স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারণ ৯ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গন স্টেডিয়ামের টিকিটের দাম ছিল ৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে—যা সাধারণ সময়ের ১০০ টাকার টিকিটের তুলনায় অনেক বেশি।
‘যারা জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখছিলেন, তারা ট্রফি নিয়ে দলের ফেরা পর্যন্ত মধ্যরাত অবধি ক্লাবেই ঠায় বসে ছিলেন,’ বলছিলেন পারিজাত, যার দাদা ১৯৬০ সালে কাজের খোঁজে কলকাতা এসেছিলেন।
জাদুকরী এই ট্রফির মহিমা তুলে ধরে পারিজাত আরও যোগ করলেন, '২০২২ সালে আমাদের মিউজিয়ামটি চালু হওয়ার পর থেকে সাধারণত দিনে গড়ে ৫০ জনের মতো দর্শনার্থী আসতেন। কিন্তু এই শিরোপা জেতার পর থেকে ট্রফিটি কেবল একনজর দেখার জন্য প্রতিদিন অগণিত সমর্থক ভিড় করছেন।' উল্লেখ্য, এই পারিজাতই একসময় গ্যালারিতে বসে রুমি, মুন্না, আসলাম আর গাউসদের জাদু দেখেছিলেন।
ইস্ট বেঙ্গলের এই মাহেন্দ্রক্ষণ যেন মিলে গেছে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালেরও দীর্ঘ ২২ বছর পর লিগ শিরোপা জেতার অপেক্ষার অবসানের সঙ্গে—সময়ের এক সুতোয় যেন বাঁধা পড়ল দুটি ভিন্ন ফুটবল দুনিয়া, যেখানে দীর্ঘ ধৈর্য আর অল্পের জন্য হাতছাড়া হওয়ার এক দীর্ঘ আক্ষেপের চিরসমাপ্তি ঘটল।