গোয়ার দুই রূপ: দক্ষিণের শান্ত পরিবেশ থেকে উত্তরের কোলাহল
গত ২৬ মে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভোরে পৌঁছানোর পর, বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা যেন শেষই হতে চাইছিল না। তবে ডিপার্চার গেটের পরিবেশটি একটু স্বস্তি দিয়েছিল। একদল প্রাণবন্ত তরুণ-তারুণী রঙিন পোশাক আর জমকালো মেকআপে সেজে বিপুল উৎসাহ নিয়ে কাছাকাছি জড়ো হয়েছিল। তাদের সেই চঞ্চল উপস্থিতি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে আমি গোয়া যাচ্ছি; আরব সাগরের তীরে সৈকত আর জমকালো রাতের জীবনের জন্য বিখ্যাত ভারতের এক রাজ্য।
তবে কোলাহলপূর্ণ গোয়ার সেই ছবি দ্রুতই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ বুঝতে আমার কিছুটা সময় লেগে যায়। কারণটি সহজ: দক্ষিণ গোয়া এবং উত্তর গোয়ার বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা, যা পর্যটকদের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দেয়।
আকাশে প্রায় তিন ঘণ্টা কাটানোর পর, ইন্ডিগো ফ্লাইটটি সাধারণ মানের ডাবোলিম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে। বিমানের জানালা দিয়ে শ্যাওলা পড়া রানওয়ে এবং শুষ্ক, শান্ত চারপাশ একদমই ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরেছিল। বিমানবন্দরটিকে মনে হচ্ছিলো প্রাণহীন, যা গোয়াকে নিয়ে অনেকের মনে থাকা ধারণার বাইরে।
টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ গোয়ার মারগাওয়ের দিকে রওনা হওয়ার পর আরেক অভিজ্ঞতা। আমার হোটেলটি ছিল বাংলাদেশ নারী দলের আবাসন 'প্ল্যানেট হলিউড বিচ রিসোর্ট' এবং সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ভেন্যু 'পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়াম'-এর ঠিক মাঝামাঝি। প্রথম যে বিষয়টি আমাকে ছুঁয়ে যায়, তা হলো লবণের গন্ধ বয়ে আনা ভারী বাতাস। উত্তর গোয়ার আরও প্রাণবন্ত রূপের মুখোমুখি হওয়ার আগে সেই অনুভূতিটি আমার সঙ্গে বেশ কিছুদিন ছিল।
পর্তুগিজ ঐতিহ্যের ছাপ ও শান্ত জীবনযাত্রা
বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের সেই গাড়ি যাত্রা আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। রাস্তার দুপাশে দেখা যাচ্ছিল চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা পর্তুগিজ শাসনের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। ঐতিহ্যবাহী গোয়ান-পর্তুগিজ ভিলাগুলো পুরো এলাকা জুড়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে মিশে ছিল। সেগুলোর আকাশী নীল, হালকা হলুদ এবং গাঢ় গেরুয়া রং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে একটি চমৎকার দৃশ্য তৈরি করেছিলো।
হেলে পড়া নারকেল গাছের সারির মধ্য দিয়ে চুইয়ে পড়া সূর্যালোক দেখতে দারুণ লাগত। রাস্তায় গাড়ির চাপ ছিল লক্ষণীয়ভাবে কম, আর কিছু দূর পরপরই রাস্তার পাশে ছোট ছোট গির্জা দেখা যাচ্ছিল। দক্ষিণ গোয়ার প্রধান কেন্দ্র মারগাও জুড়ে এমন অনেক গির্জা পাওয়া যায়, যা পর্যটকদের এই রাজ্যের সঙ্গে একটি আত্মিক পরিচয় করিয়ে দেয়।
মারগাও, বিশেষ করে দক্ষিণ গোয়ার জীবনযাত্রা ধীর গতির। এটি রাস্তাঘাটে স্পষ্ট, সেখানে চালকদের গতি বাড়ানোর বা একে অপরকে ওভারটেক করার কোনো তাড়া নেই—ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্রাফিক সংস্কৃতির তুলনায় এ এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ট্রাফিক পুলিশ বা সিগন্যাল না থাকা সত্ত্বেও গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং স্কুটারগুলো মোড়গুলোতে ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে আসছিল এবং প্রায়শই অন্যদের আগে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছিল।
উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে দিনের বেলা অনেকে বাড়ির ভেতরেই থাকতেন, তবে সূর্যাস্তের পর রাস্তাগুলো সচল হয়ে উঠত। মারগাওয়ের পরিষ্কার, ধুলাহীন বাতাসে সন্ধ্যার হাঁটা বিশেষভাবে সতেজতা এনে দিত।
যাতায়াতের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তব চিত্র
এখানে পর্যটকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবহন। গোয়ায় কোনো ইন্টারনেট-ভিত্তিক রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ (যেমন উবার বা পাঠাও) নেই, যার ফলে ট্যাক্সিই প্রধান ভরসা। হলুদ রঙের রেজিস্ট্রেশন প্লেট দেখে সহজেই চেনা যায় এমন ট্যাক্সিচালকরা প্রায়শই চড়া ভাড়া দাবি করেন। এমনকি ছোট ট্রিপগুলোর জন্যও সাধারণত কমপক্ষে ৫০০ রুপি খরচ হয়। টুর্নামেন্ট চলাকালীন, বাংলাদেশ নারী দলের হোটেল এবং মারগাওয়ে আমার হোটেলের মধ্যকার নয় কিলোমিটারের যাত্রায় প্রায়শই ১,০০০ থেকে ১,২০০ রুপি খরচ হয়ে যেত।
শহরের বাইরে পরিবহন খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন। একবার ওল্ড গোয়ার উপকণ্ঠে ট্যাক্সি বা সিএনজির খোঁজে আমি প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলাম। অবশেষে, এক স্থানীয় তরুণ দেম্পো স্পোর্টস ক্লাব থেকে মারগাও থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'বাসিলিকা অব বোম জেসাস' পর্যন্ত আমাকে বাইকে লিফট দিয়ে রক্ষা করেছিলেন।
বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে নিজে গাড়ি বা বাইক চালানোই সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প। অসংখ্য রেন্টাল সার্ভিস জ্বালানি খরচ ছাড়া ৩০০ থেকে ৫০০ রুপির দৈনিক ভাড়ায় গাড়ি এবং মোটরসাইকেল দেয়। একটি যান ভাড়া করার জন্য সাধারণত কেবল পাসপোর্টের কপি এবং একটি ফেরতযোগ্য নিরাপত্তা আমানতের প্রয়োজন হয়।
যাদের নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা নেই, তাদের জন্য গোয়ার বাস নেটওয়ার্ক একটি সাশ্রয়ী ও ভালো বিকল্প। একটি বিশেষ আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল যাত্রীদের কোনো উদ্বেগ ছাড়াই বাসের ওপরের তাকে তাদের ব্যাকপ্যাক রাখা। ঢাকায় এমন বিশ্বাস বিরল, যেখানে পকেটমারের ভয়ে যাত্রীরা সবসময় ব্যাগ বুক দিয়ে আগলে রাখেন। তবে কিছু মিলও ছিল; রাতে সেখানেও বাস টার্মিনালগুলোতেই ফুটপাতে মাদকাসক্তদের শুয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ফাতোর্দা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো কাভার করার পর হোটেলে ফেরার পথে ছিনতাইয়ের কোনো ভয় ছিল না। বরং অন্ধকার নামার পর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য বেওয়ারিশ কুকুর তৈরি করত অস্বস্তি। মাঝেমধ্যে ২০ থেকে ৩০টি কুকুর একসঙ্গে জড়ো হতো, যা একটি ভীতিকর দৃশ্য তৈরি করত, যদিও তারা কখনো আক্রমণ করেনি।
মারগাওয়ের ভেতরের রাস্তাগুলো তুলনামূলকভাবে সরু হলেও, দক্ষিণ ও উত্তর গোয়াকে সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কগুলো বেশ প্রশস্ত, কিছু অংশে ছয় লেনের। ওল্ড গোয়ার একটি আশ্চর্যজনক দৃশ্য ছিল পর্তুগিজ আমলের ঘরবাড়ির সংরক্ষণ, যার মধ্যে অনেকগুলো সরু রাস্তার মাঝে চেপে থাকা সত্ত্বেও অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে।
ষোড়শ শতাব্দীর বাসিলিকা অব বোম জেসাস পরিদর্শন ছিল এই সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি এর অনন্য স্থাপত্য এবং সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের সমাধিস্থল হিসেবে বিখ্যাত। আমি যখন যাই, তখন এই ঐতিহাসিক গির্জার ভেতরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান মাঝরাতে চলছিলো, এই আয়োজন দেখা এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
দুই ভিন্ন রূপের রাজ্য
দক্ষিণ গোয়া এবং উত্তর গোয়ার মধ্যকার পার্থক্য বেশ চোখ ধাঁধানো। উত্তর গোয়া নিঃসন্দেহে অনেক বেশি প্রাণবন্ত এলাকা, মানুষ, যানবাহন, দোকানপাট, বার, রেস্তোরাঁ, বহুতল ভবন এবং নদীর তীরে গড়ে ওঠা ক্যাসিনো দিয়ে সবসময় গমগম করে।
তবে গোয়া কেবলই একটি সৈকত দেখার জায়গা নয়। এটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য, যা পরিষ্কার জলে স্কুবা ডাইভিং, বনের মধ্য দিয়ে ট্র্যাকিং, পাহাড়ের চূড়ায় চড়া এবং নানা ধরনের ওয়াটার স্পোর্টসের সুযোগ দেয়।
সৈকতগুলো নিজেই এই রাজ্যের দ্বৈত রূপকে ফুটিয়ে তোলে। আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত সৈকতগুলো শান্ত ও সুন্দর। এর বিপরীতে, উত্তর গোয়ার পাবলিক সৈকতগুলো সবসময় জমজমাট। পাব, বার, ডিস্কো এবং রেস্তোরাঁগুলো নিয়ন আলোর নিচে জ্বলে ওঠে এবং পর্যটকরা প্রতি সন্ধ্যায় সময় কাটাতে সেখানে ভিড় করেন। সেখানকার পরিবেশ কিছুটা থাইল্যান্ডের বিখ্যাত পাতায়া বিচের কথা মনে করিয়ে দেয়।
গোয়াকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে এটি মানতে হবে যে এই রাজ্যের দুটি ভিন্ন রূপ রয়েছে। দক্ষিণ গোয়া প্রশান্তি, ঐতিহ্য এবং বিশ্রামের সুযোগ দেয়, অন্যদিকে উত্তর গোয়া বিনোদন এবং উত্তেজনা উপহার দেয়। কোথায় সময় কাটাবেন তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে আপনি আসলে কী খুঁজছেন তার ওপর।
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সমাপ্তির সঙ্গেই গোয়ায় আমার দিনগুলোও শেষ হয়ে গেছে। গত ৬ জুন ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে বাংলাদেশের টানা তৃতীয় শিরোপা জয়ের আশা ভেঙে যায়।
টুর্নামেন্টটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈপরীত্যে ঘেরা এক গন্তব্যে একটি স্মরণীয় যাত্রারও অবসান ঘটে—ইতিহাস ও আধুনিকতা, শান্ত ও অশান্ত পরিবেশ, দক্ষিণ ও উত্তর, এবং প্রতিযোগিতা ও ঘুরে বেড়ানোর মধ্যকার এক চমৎকার অভিজ্ঞতা।