১৮ বছর, ২৯টি ক্লাব, ৩৯ বার দল পাল্টানো: এক ‘যাযাবর’ ফুটবলারের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক

১৮ বছরে ২৯টি আলাদা ক্লাব। এই দীর্ঘ সময়ে দল পাল্টেছেন মোট ৩৯ বার! পেশাদার, আধা পেশাদার ও অপেশাদার ফুটবল মিলিয়ে এতগুলো ক্লাবের জার্সি গায়ে জড়ানোর ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে বিরল বললেও কম বলা হয়। উইঙ্গার জেফ থমাসের ক্যারিয়ার যেন আক্ষরিক অর্থেই এক ‘যাযাবর’ জীবন— যা বর্ণাঢ্য না হলেও নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।

শুক্রবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির কাছে এমন ঘন ঘন ক্লাব বদলানোর রহস্যটা বেশ সোজা সাপ্টা ভাষাতেই খোলাসা করেছেন ৩৬ বছর বয়সী এই ফুটবলার। থমাস বলেছেন, ‘আমার যতটা প্রাপ্য বলে মনে করতাম, সেই টাকা না পেলে আমি অন্য কোথাও চলে যেতাম।’

পুরো নাম জেফানিয়া জোসেফ থমাস। তিনি এখন থিতু হয়েছেন দক্ষিণ ইয়র্কশায়ারের ক্লাব ডিয়ার্ন অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্টে। ইংল্যান্ডের ফুটবল কাঠামোর নবম স্তরে খেলছে তারা। ২০২৪ সালে খেলোয়াড়-কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অধীনেই ক্লাবটি ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো এফএ কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

আগামীকাল শনিবার প্রাক-প্রাথমিক পর্বের ম্যাচে একই স্তরের রানকর্ন টাউনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে গোল্ডথর্প গ্রামে অবস্থিত দলটি। এই সাফল্য নিয়ে থমাস বলেছেন, ‘আমরা ২০২১ সালে ডনকাস্টার স্যাটারডে লিগে ছিলাম। সেখান থেকে এখন এফএ কাপে খেলছি। এই এলাকার জন্য এটি বিশাল ব্যাপার। কারণ তারা এই দলকে কখনোই এই প্রতিযোগিতায় খেলতে দেখেনি।’

ইংল্যান্ডের নন-লিগ (শীর্ষ চারটি স্তরের নিচের ফুটবল লিগগুলো) ফুটবল থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার নানা স্তরের লিগে খেলে বেড়িয়েছেন থমাস। তার খেলা ২৯টি ক্লাবের দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকালে যে কেউ থমকে যেতে বাধ্য! ইংল্যান্ডের একই ক্লাবে বারবার ফেরার অভ্যাসও দেখা গেছে তার— সবচেয়ে বেশি পাঁচ দফায় খেলেছেন রসিংটন মেইনে। এছাড়া, মিকলওভার স্পোর্টসে চার দফায়, ফ্রিকলি অ্যাথলেটিকে তিন দফায় এবং ব্রিগহাউজ টাউনে দুই দফায় খেলেছেন।

ফুটবল ক্যারিয়ার তাকে টেনে নিয়ে গেছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের গার্ডেন সিটি ব্রঙ্কবাস্টার্স, বেলজিয়ামের মন্তেনি, কানাডার থান্ডার বে চিল কিংবা স্কটল্যান্ডের কাউডেনবিথের মাঠেও। তাছাড়া, ইংল্যান্ডের বোস্টন ইউনাইটেড, শেফিল্ড, হ্যারোগেট টাউন, ইলকেস্টন টাউন, ম্যাটলক টাউন, শ লেন, সেলবি টাউনের মতো ডজন ডজন ক্লাবের জার্সি জড়িয়েছেন তিনি। সবচেয়ে লম্বা সময় ছিলেন ব্রিগহাউজ টাউনে— দ্বিতীয় দফায় খেলেছেন ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

থমাসের ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল রদারহ্যাম ইউনাইটেডের যুব দলে। সেখানে তার কোচ ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ফরোয়ার্ড মার্ক রবিন্স। কিন্তু আচরণগত ভুলের কারণে ২০০৮ সালে কোনো সিনিয়র ম্যাচ না খেলেই বাদ পড়েন তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তার ‘যাযাবর’ ফুটবল জীবন।

সেই স্মৃতি হাতড়ে থমাস বলেছেন, ‘তখন আমি কিছুটা খিটখিটে মেজাজের ও অবুঝ ছিলাম। আমার মনে আছে, রিজার্ভ দলের একটি ম্যাচে গোল করার পরদিন (শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য) আমাদেরকে অনুশীলনে আসতে বলা হয়েছিল। সে সময় আমি ভেবেছিলাম, আমার এসব করার কোনো দরকার নেই। সত্যি বলতে, আমার মনোভাব যদি আরও ভালো হতো, তবে সম্ভবত আমি ঠিকমতোই খেলতে পারতাম।’

২০১৩ সালে উরুর চোট আর হতাশায় প্রায় ফুটবল ছেড়েই দিয়েছিলেন থমাস। রদারহ্যামের একটি কল সেন্টারে কাজ শুরু করেছিলেন। এমনকি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চিন্তাও করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই কানাডার ক্লাব থান্ডার বে চিল তাকে আবারও মাঠে ফেরায়।

বারবার ঠিকানা বদলের হিসাব রেখেছেন কি না, এমন প্রশ্নে থমাসের অকপট জবাব, ‘একদমই না। নিশ্চিতভাবেই এত বেশি যে, গোনা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে একটা ভালো অভিজ্ঞতা। তবে আরও ভালো হতে পারত। বেশি টাকার জন্য আমি ওপরের স্তরের বা একই স্তরের অন্য ক্লাবে গিয়েছি। ভিন্ন ভিন্ন দেশে খেলাটা অবশ্য দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। সুযোগ পেলে তরুণ খেলোয়াড়দেরও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা নেওয়ার উৎসাহ দেব আমি। কারণ আমি ভিন্ন ভিন্ন ধারণা ও দর্শনের বিভিন্ন কোচের অধীনে কাজ করেছি।’

নানা ক্লাবে খেলার মাঝেই থমাসের আন্তর্জাতিক ফুটবলেও অভিষেক হয়। ১৯৮৯ সালে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নিলেও পারিবারিক শেকড়ের সূত্র ধরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশ সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই উইঙ্গার।

বর্তমানে স্ত্রী ম্যারি ও দুই সন্তানকে নিয়ে ডিয়ার্ন অ্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট ক্লাবের মাঠ থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের বসবাস করছেন থমাস। এই ছোট্ট দলটিতে খেলোয়াড় হিসেবেও নিবন্ধিত থাকলেও মূলত তার ভূমিকাটা কোচের। পাশাপাশি ডার্বি কাউন্টির অনূর্ধ্ব-১২ দলের কোচের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন তিনি।

তরুণ খেলোয়াড়দের পরামর্শ দিতে গিয়ে নিজের অতীতের কথা মনে করে হেসে ওঠা থমাস বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে নিজেকে কিছুটা কপট মনে হয়। কারণ বাড়তি টাকার জন্য আমি একসময় বারবার ক্লাব পাল্টাতাম। আর এখন আমি আমার খেলোয়াড়দের বলি, “যা করছ তা চালিয়ে যাও। কারণ টাকা এমনিতেই আসবে।”’