ভার্দিওলের শেষ মুহূর্তের গোলে জয়ের পর মারেস্কা বললেন, ‘আমিও পারব’
পেপ গার্দিওলার বিদায়ের পর ম্যানচেস্টার সিটির নতুন যুগের শুরুটা হতে পারত দুশ্চিন্তারও। একসময় মনে হচ্ছিল, গার্দিওলার ছায়া পেরিয়ে প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেতে যাচ্ছে সিটি। কিন্তু শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় স্বস্তি পেলেন এনজো মারেস্কা। আর ম্যাচ শেষে ইতালিয়ান কোচের মন্তব্যে ফুটে উঠল আরও বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সময় ও সুযোগ পেলে গার্দিওলার মতো সাফল্য তিনিও এনে দিতে পারেন সিটিকে।
রোববার ইতিহাদ স্টেডিয়ামে বোর্নমাউথের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় দিয়ে প্রিমিয়ার লিগে সিটির কোচ হিসেবে নিজের অধ্যায় শুরু করেছেন মারেস্কা। তবে জয়টি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমার্ধে মার্কাস ট্যাভার্নিয়ারের গোলে পিছিয়ে পড়ে সিটি। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণে সৃষ্টিশীলতার অভাব এবং রক্ষণে সমন্বয়হীনতায় ভুগেছে তারা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৮৪ মিনিটে মার্ক গুয়েহির গোলে সমতায় ফেরে সিটি। যোগ করা সময়ে ইয়োশকো ভার্দিওলের গোলে আসে নাটকীয় জয়।
গার্দিওলার অধীনে এক দশক ছিল সিটির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সময়গুলোর একটি। স্প্যানিশ কোচের সময়ে ক্লাবটি জিতেছে ২০টি ট্রফি, যার মধ্যে রয়েছে ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। ২০১৬ সালে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় দিয়ে গার্দিওলার সিটি-যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর মারেস্কার প্রথম ম্যাচও শেষ হলো দেরিতে পাওয়া জয়ে। তাই শুরুতেই গার্দিওলার সঙ্গে তুলনা চলে আসাটাও স্বাভাবিক।
তবে মারেস্কা সেই তুলনা থেকে পিছিয়ে যেতে চান না। বরং দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট সময় পেলে গার্দিওলার সাফল্যের কাছাকাছি যাওয়ার আত্মবিশ্বাসই দেখিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, 'আমাকে সময় দেওয়া হলে আমিও গার্দিওলার মতো অনেক ট্রফি জিততে পারব।'
তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে সিটিকে বেশ কিছু বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলেও মনে করেন মারেস্কা। ক্লাবটিতে এখন চলছে বড় ধরনের রদবদল। রদ্রি, বের্নার্দো সিলভা, জন স্টোনস, নাথান আকে ও তিজানি রেইনদার্স ক্লাব ছেড়েছেন। এর সঙ্গে সাভিনিও টটেনহামে যাওয়ার পথে।
মারেস্কাও জানেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন দলকে গুছিয়ে তুলতে সময় প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, 'ক্লাবটিতে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং দলকে নতুনভাবে তৈরি করতে আমাদের সময় প্রয়োজন।'
গার্দিওলার বিদায়ের পর সিটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, তার রেখে যাওয়া বিশাল শূন্যতা কীভাবে পূরণ করবেন মারেস্কা? গত সপ্তাহের কমিউনিটি শিল্ডে আর্সেনালের কাছে ৩-০ গোলে হারের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছিল। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ম্যাচেও শুরুতে সেই দুশ্চিন্তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই সিটির খেলায় ছিল কিছুটা অস্বস্তি। আক্রমণে এরলিং হলান্ডকে ঘিরে প্রত্যাশিত সমন্বয় দেখা যায়নি, মাঝমাঠেও সৃজনশীলতার ঘাটতি ছিল। রক্ষণেও ছিল অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন। মারেস্কা একাদশে এমন ছয়জন খেলোয়াড়কে রেখেছিলেন, যাদের মূল পরিচয়ই রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে। ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাক গুয়েহিকে তিনি খেলিয়েছেন মাঝমাঠে। আর সাধারণত বাঁ প্রান্তে খেলা নিকো ও'রেইলিকে ঠেলে দিয়েছেন হালান্ডের কাছাকাছি আক্রমণভাগে।
নতুন মৌসুমের আগে হালান্ডও নিজের চেহারায় পরিবর্তন এনেছেন। লম্বা স্বর্ণালি চুল কেটে ছোট করেছেন তিনি। নিজের নতুন লুক নিয়ে নরওয়ের এই তারকার মন্তব্য ছিল, 'নতুন মৌসুম, নতুন চুলের ছাঁট।' কিন্তু মাঠে সেই নতুন মৌসুমের শুরুটা তার জন্য ভালো হয়নি।
ও'রেইলির ক্রস থেকে খুব কাছ থেকে গোল করার সহজ সুযোগ পেয়েও বল বাইরে পাঠিয়ে দেন হালান্ড। পরে দ্বিতীয়ার্ধে গুয়েহিও প্রায় গোললাইন থেকে হেড করে গোল করতে ব্যর্থ হন। ফলে সিটির সমর্থকদের হতাশা আরও বাড়তে থাকে।
এরই মধ্যে ২৬ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে এগিয়ে যায় বোর্নমাউথ। ইভানিলসনের নিখুঁত ক্রস সিটির পেনাল্টি এলাকার ভেতর দিয়ে চলে যায়। রুবেন দিয়াস ও আবদুকোদির খুসানভ তখন প্রায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই সুযোগে মার্কাস ট্যাভার্নিয়ার ছয় গজ দূর থেকে গিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে পরাস্ত করে বোর্নমাউথকে এগিয়ে দেন।
হালান্ডের সঙ্গে ফিল ফোডেন ও অঁতোয়ান সেমেনিওর বোঝাপড়াও খুব একটা জমেনি। হালান্ডের একটি হেড অবশ্য দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন বোর্নমাউথের গোলরক্ষক দর্জে পেত্রোভিচ।
বিরতির পরপরই সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেন গুয়েহি। ফোডেনের কর্নার থেকে প্রায় গোললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে হেড করেও বল জালে পাঠাতে পারেননি তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে গ্যালারি থেকেও অসন্তোষের শব্দ শোনা যায়। চেলসির কোচ থাকাকালে মারেস্কার খেলার ধরন নিয়ে সমর্থকদের অসন্তোষ নিয়মিতই ছিল। তাই সিটিতে দায়িত্ব নেওয়ার ৯০ মিনিটও পূর্ণ হওয়ার আগে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া শুনতে পাওয়াটা ক্লাব কর্তৃপক্ষের জন্য স্বস্তির বিষয় ছিল না।
কিন্তু এখানেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মারেস্কা। ফরাসি প্লেমেকার রায়ান শেরকিকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর সেই বদলই শেষ পর্যন্ত সিটির প্রত্যাবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৮৪ মিনিটে শেরকির নেওয়া কর্নার সোজা চলে যায় গুয়েহির দিকে। এবার আর ভুল করেননি সিটির নতুন রক্ষণভাগের এই খেলোয়াড়। নিখুঁত হেডে পেত্রোভিচকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান তিনি।
তাতেই শেষ নয়। যোগ করা সময়ে আবারও শেরকির পায়ের জাদু। বোর্নমাউথের রক্ষণভাগের মাঝখান দিয়ে দারুণ এক পাস বাড়িয়ে দেন তিনি। সেই বল নিয়ন্ত্রণ করে গভার্দিওল ঠান্ডা মাথায় জালে পাঠান। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় সিটি। সাইডলাইনে তখন উচ্ছ্বাসে মুষ্টি ছুড়ছেন মারেস্কা।