বিশ্বকাপের ১৬ দিন বাকি

জোহানেসবার্গের সেই রাত ও রোবেনের চিরস্থায়ী আক্ষেপ

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

১১ জুলাই, ২০১০। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা। ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। পুরো ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছিল নতুন এক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেখার জন্য।

নেদারল্যান্ডসের সামনে হাতছানি ছিল ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ সালের আসরের টানা দুটি ফাইনালে হারের আক্ষেপ ঘুচিয়ে প্রথমবার বিশ্বজয়ের মুকুট পরার। 'টোটাল ফুটবল'-এর আবিষ্কারক দেশটির একজন ফুটবলারের সামনে সুযোগ ছিল অমরত্ব লাভের। কিন্তু রাতটি তার জন্য হয়ে ওঠে আজীবনের এক দুঃস্বপ্ন।

উইঙ্গার আরিয়েন রোবেন সেই বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন দারুণ ফর্ম সঙ্গে নিয়ে। তবে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে দুর্দান্ত একটি মৌসুম কাটানোর পর ফুটবলের মহাযজ্ঞ থেকে তিনি প্রায় ছিটকেই যাচ্ছিলেন। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়েন তিনি।

ডাচ কোচ বার্ট ফন মারউইক অবশ্য নিজেদের সেরা অস্ত্রকে ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা ভাবতে পারেননি। তাই দলের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয় তাকে। গ্রুপ পর্বে ডেনমার্ক ও জাপানের বিপক্ষে প্রথম দুটি ম্যাচ মিস করলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরেন রোবেন। ক্যামেরুনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটিতে বদলি হিসেবে নামার পর বিশ্বকাপের বাকি অংশে তিনি হয়ে ওঠেন দলের আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা।

নকআউট পর্বে রোবেনের পারফরম্যান্স ছিল জাদুকরী। শেষ ষোলোতে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে তার ট্রেডমার্ক 'কাট ইনসাইড' গোল এবং সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে করা দুর্দান্ত হেড নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে পৌঁছে দেয়। ডান প্রান্ত দিয়ে তার ক্ষিপ্রগতির দৌড় এবং বাঁ পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ বারবার পরাস্ত হচ্ছিল।

ফাইনালেও তারকাখচিত স্পেনের টিকি-টাকা ফুটবলের বিপরীতে নেদারল্যান্ডসের পাল্টা-আক্রমণনির্ভর কৌশলের মূল চাবিকাঠি ছিলেন রোবেন।

আফ্রিকা মহাদেশের মাটিতে বিশ্বকাপের প্রথম ফাইনালটি যদিও নান্দনিকতার চেয়ে শারীরিক শক্তির প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল বেশি। রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবের পকেট থেকে মুড়ি-মুড়কির মতো বের হতে থাকে কার্ড। তাই ফুটবলীয় সৌন্দর্য উপভোগের যে সম্ভাবনা ছিল ভক্তদের, তা বেশ কিছুটা ম্লানই হয়ে গিয়েছিল। এসবের মাঝে স্প্যানিশদের বল দখলের আধিপত্যের বিপরীতে ডাচদের প্রতিটি আক্রমণে রোবেন ছিলেন সবচেয়ে বড় ত্রাস। কিন্তু 'নায়ক' হয়ে ওঠার মুহূর্তে সবচেয়ে বড় গড়বড়টা করে ফেলেন তিনি।

ঘড়ির কাঁটায় ম্যাচের বয়স তখন ৬২ মিনিট। স্কোরলাইন ০-০। নিজেদের অর্ধ থেকে বল পেয়ে ওয়েসলি স্নাইডার স্পেনের রক্ষণভাগ ভেদ করে একটি জাদুকরী থ্রু পাস বাড়ান। লা রোহাদের দুই তারকা ডিফেন্ডার কার্লোস পুয়োল ও জেরার্দ পিকেকে পেছনে ফেলে সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নেন রোবেন। তীব্র বেগে ছুটে যান ডি-বক্সের দিকে। সামনে কেবল গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস। পুরো স্টেডিয়াম যেন পিনপতন নীরবতায় স্তব্ধ!

ডি-বক্সে ঢুকে রোবেন বাঁ পায়ে শট নেন। গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা ক্যাসিয়াস ততক্ষণে ভুল দিকে ডাইভ দিয়েছেন। কিন্তু তার 'রিফ্লেক্স' ছিল অবিশ্বাস্য। শরীরের ভারসাম্য হারানোর মুহূর্তেও ডান পা উঁচু করে ফেলেন। তার বুটের ডগায় লেগে বলটি পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। রোবেন মাথায় দুহাত দিয়ে অবিশ্বাস নিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকেন কিছুক্ষণ।

একটি শট, সামান্য একটু উচ্চতা থাকলেই জালে ঢুকতে পারত বল— ডাচরা পেতে পারত প্রথম বিশ্বকাপের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাদ। কিন্তু তা হয়নি। 'সেন্ট ইকার' হিসেবে খ্যাত ক্যাসিয়াসের ওই সেভ কেবল ম্যাচের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিয়েছিল। এরপর রোবেন আরও একটি সুযোগ পেয়েছিলেন ৮৩তম মিনিটে। কিন্তু ক্যাসিয়াস আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ান।

নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকার পর ফাইনাল গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১৬তম মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা যখন স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন, তখন রোবেন ও ডাচদের হৃদয় ভাঙার শব্দ জোহানেসবার্গের আকাশ ছাড়িয়ে যেন পুরো নেদারল্যান্ডসে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল!

গোলরক্ষককে একা পেয়েও রোবেনের সেই মিস তাকে দিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত এক চিরস্থায়ী আক্ষেপ। তবে তা মেনে নিয়ে পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'অবশ্যই এই আক্ষেপ সারা জীবন আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে... সেসবের আর কোনো গুরুত্ব নেই এখন। ওটা অতীত, আর খেলাধুলায় এমনটা ঘটেই থাকে।'

চার বছর পর ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সালভাদরে আবারও মুখোমুখি হয় স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি ডাচদের জন্য ছিল এক প্রতিশোধের মিশন। আর রোবেন হয়তো জোহানেসবার্গের সেই কালো রাতের হতাশা থেকেই জ্বালানি সংগ্রহ করেছিলেন। স্প্যানিশ রক্ষণভাগকে আক্ষরিক অর্থেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলেন তিনি।

নেদারল্যান্ডস ৫-১ গোলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে বিধ্বস্ত করে। রোবেন করেছিলেন চোখ ধাঁধানো জোড়া গোল। কিন্তু বিশ্বকাপের সামগ্রিক ক্যানভাস বিবেচনায় সেই বিশাল জয় এবং রোবেনের অতিমানবীয় নৈপুণ্য কেবল পুরনো ক্ষতে সামান্য প্রলেপ দিতে পেরেছিল।