বিশ্বকাপের ৬ দিন বাকি

বিশ্বকাপে না খেলার অবিশ্বাস্য কিছু নেপথ্য গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফুটবল। চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে যখন এই মহাযজ্ঞের দামামা বাজে, তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ফুটবলাররাও স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার জন্য নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত নিংড়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন। চোট বা উপেক্ষিত হওয়ার কারণে শেষ মুহূর্তে বিশ্বমঞ্চের টিকিট না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য তাই খুব চেনা ছবি। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পূর্ণ করতে যাওয়া বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলায় এমন কিছু মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, খ্যাপাটে মেজাজ কিংবা চরম আপসহীন চরিত্রের দেখা মিলেছে, যারা দলের অবধারিত অংশ হয়েও শেষ পর্যন্ত খেলেননি এই মহারণে।

২০২৬ বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর আবহ যখন চারদিকে বইছে, ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, তখন ইতিহাসের পাতা ওল্টালে পাওয়া যায় এমন কিছু মানুষকে, যাদের বিশ্বমঞ্চে না থাকার নেপথ্য কারণগুলো ফুটবল দুনিয়ায় নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারও ক্ষেত্রে তা পরিবারের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়, কারও ক্ষেত্রে কোচের সাথে আদর্শিক সংঘাত, কারও ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তের চোটের পরিহাস, আর কারও ক্ষেত্রে এক বিরল খেলোয়াড়সুলভ সততা।

ফুটবলের সর্বোচ্চ আয়োজনের আলোকিত আসর থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া বা ছিটকে যাওয়া এমন ছয়টি আলোচিত চরিত্রকে নিয়ে এবারের আয়োজন।

ইয়োহান ক্রুইফ (১৯৭৮)

১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। নেদারল্যান্ডসের ফুটবল ইতিহাসের সেরা তারকা ইয়োহান ক্রুইফ বুয়েন্স এইরেসের বিমানে উঠলেন না। গোটা ফুটবল বিশ্ব তখন স্তম্ভিত। চারদিকে ডালপালা মেলল এক রাজনৈতিক তত্ত্ব— তৎকালীন আর্জেন্টাইন সামরিক জান্তা সরকারের নৃশংস একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তার এই মহৎ বর্জনের সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ তিন দশক ফুটবল দুনিয়া এই রাজনৈতিক তত্ত্বেই বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু ২০০৮ সালে হুট করেই সব রহস্যের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দেন খোদ ক্রুইফ নিজেই।

এক সাক্ষাৎকারে ডাচ কিংবদন্তি ক্রুইফ জানান, বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে বার্সেলোনায় নিজের বাসায় সপরিবারে ভয়াবহ ডাকাতি ও অপহরণ চেষ্টার শিকার হয়েছিলেন তিনি। একদল সশস্ত্র অপরাধী ক্রুইফ ও তার স্ত্রীকে রুমে বেঁধে ফেলে, তাদের সন্তানদের সামনেই মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে রেখেছিল। সেই ভয়াবহ ট্রমার পর পরিবারকে একা রেখে হাজার মাইল দূরে ফুটবল খেলার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না তিনি।

ক্রুইফ বলেছিলেন, ‘জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন অন্য কিছু মূল্যবোধ বড় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা চেয়েছিলাম, এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবং একটু বিচক্ষণ হতে। ওটাই ছিল ফুটবল ছাড়ার সময় এবং ওই ঘটনার পর আমার পক্ষে বিশ্বকাপে খেলা সম্ভব ছিল না।’

রুদ গুলিত (১৯৯৪)

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহ আগের ঘটনা। দীর্ঘ ১৩ মাসের স্বেচ্ছানির্বাসন ভেঙে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ৪৫ মিনিট খেলেই ডাচ স্কোয়াডে ফিরেছিলেন দলের সবচেয়ে বড় তারকা রুদ গুলিত। কিন্তু আচমকা একদিন অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে স্রেফ হেঁটে বেরিয়ে গেলেন ১৯৮৮ ইউরোজয়ী এই ফরোয়ার্ড।

তৎকালীন কোচ ডিক অ্যাডভোক্যাটের কৌশলগত পরিবর্তনের সাথে কোনোভাবেই একমত হতে পারছিলেন না গুলিত। অ্যাডভোক্যাট তাকে রাইট-মিডফিল্ডে বা মাঠের ডান প্রান্তে খেলাতে চেয়েছিলেন, যা গুলিতের আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শনের পরিপন্থী ছিল। নিজের ফুটবলীয় সত্তা ও কোচের কৌশলের সাথে আপস না করে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপকে বিদায় জানিয়ে দেন তিনি।

দল ছাড়ার পর গুলিতের সেই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত হয়েছিল অত্যন্ত সংক্ষেপে, কিন্তু স্পষ্ট ভাষায়, ‘ডাচ দলের সাথে এটাই আমার শেষ।’

রয় কিন (২০০২)

২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের ঠিক আগের মুহূর্ত। আয়ারল্যান্ডের ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ও আলোচিত অধ্যায়— ‘সাইপান ঝড়’। দলের অধিনায়ক ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ড জেনারেল রয় কিন ছিলেন আপসহীন পেশাদারিত্বের এক অগ্নিপিণ্ড। প্রশান্ত মহাসাগরের সাইপান দ্বীপে দলের প্রস্তুতি ক্যাম্পের চরম অব্যবস্থাপনা দেখে রেগে আগুন হয়ে যান তিনি। তার মতে, অনুশীলনের মাঠ ছিল পাথুরে ও শক্ত, যা খেলোয়াড়দের জন্য ছিল বিপজ্জনক।

এই অপেশাদারিত্ব নিয়ে কোচ মিক ম্যাককার্থির সাথে কিনের তীব্র ঝগড়া ও বাদানুবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে দলগত সভায় পুরো দলের সামনে ম্যাককার্থির সাথে চরম দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন তিনি। এই ঝগড়ার বিবরণী থেকে জানা যায়, কিন কোচকে উদ্দেশ্য করে পুরো দলের সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছিলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমি তোমাকে গোনায় ধরতাম না, ম্যানেজার হিসেবেও তোমাকে আমি মূল্যায়ন করি না এবং মানুষ হিসেবেও তোমাকে আমি পছন্দ করি না।’

ফলস্বরূপ, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অধিনায়ককে ছাঁটাই করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নিজের জেদের কারণে বিশ্বমঞ্চে না খেলেই বিদায় নেন কিন।

নিকোলা কালিনিচ (২০১৮)

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার রূপকথার সফর সবার স্মৃতিতে রয়েছে। লুকা মদ্রিচদের ফাইনালে ওঠার সেই মহাকাব্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচের এক চরম অহংকার ও খ্যাপাটে গল্প। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ক্রোয়াটদের প্রথম ম্যাচে বদলি ফুটবলার হিসেবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে কালিনিচকে মাঠে নামাতে চেয়েছিলেন কোচ জ্লাতকো দালিচ। কিন্তু শুরুর একাদশে সুযোগ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কালিনিচ পিঠের চোটের বাহানা দেখিয়ে মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানান।

কোচ দালিচও দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই কালিনিচকে স্কোয়াড থেকে বহিষ্কার করে দেশে পাঠিয়ে দেন। ক্রোয়েশিয়া সেবার ফাইনালে উঠে রানার্সআপ ট্রফি জেতে। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কালিনিচের জন্যও একটি রৌপ্য পদক পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু কালিনিচ সেই মেডেল নিতে সাফ মানা করে দেন। তার সেই উক্তিটি ছিল ভীষণ সোজাসাপ্টা, ‘পদকের জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু আমি তো রাশিয়ায় খেলিনি।’

বেন হোয়াইট (২০২২)

আর্সেনালের ইংলিশ ডিফেন্ডার বেন হোয়াইটের গল্পটা ছিল আভিজাত্য আর চরম জেদের। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মাঝপথে সহকারী কোচের সাথে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের জেরে আকস্মিকভাবে ইংল্যান্ড দল ছেড়ে চলে এসেছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ চার বছর জাতীয় দলের যেকোনো ডাক অবলীলায় ‘না’ বলে এসেছেন হোয়াইট। কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের জমানায় বারবার সুযোগ এলেও থ্রি লায়ন্সের জার্সির প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে ছুটি কাটানো ও ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন এই তারকা।

আসন্ন বিশ্বকাপ সামনে রেখে ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে যখন বদল এলো, নতুন কোচ হয়ে এলেন থমাস টুখেল, তখন অবসান ঘটে হোয়াইটের এই দীর্ঘ আত্মনির্বাসনের। গত মার্চে টুখেলের ডাকে সাড়া দিয়ে অবশেষে দলে ফেরেন তিনি। উরুগুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করে নিজের প্রত্যাবর্তন রাঙিয়েছিলেন, খেলেছিলেন জাপানের বিপক্ষেও। চার বছর পর জাতীয় দলের প্রতি তার অনীহার অধ্যায় ঘুচিয়ে হোয়াইট যখন উত্তর আমেরিকাগামী বিমানে ওঠার জন্য প্রস্তুত, ঠিক তখনই আঘাত হেনেছে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।

গত মে মাসে ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে লিগামেন্টে গুরুতর চোট পান হোয়াইট। ফলে এই মৌসুমের পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে তাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াড থেকেও ছিটকে যেতে হয়েছে। তাই এবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চোটের কারণে দর্শক হয়েই ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে তাকে।

ওদসন এদুয়ার্দ (২০২৬)

এই তালিকায় সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও সততার সঙ্গে ‘না’ বলার গল্পটি লিখেছেন ওদসন এদুয়ার্দ। ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে আলো ছড়ানো এই স্ট্রাইকার যখন মূল ফরাসি দলে জায়গা পাচ্ছেন না, তখন ২০২৬ বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে তার সামনে আসে অন্য একটি দেশের হয়ে সরাসরি বিশ্বমঞ্চে খেলার লোভনীয় সুযোগ। তার বাবা-মা হাইতির নাগরিক হওয়ায়, ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া দলটির ফুটবল ফেডারেশন তাকে দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ব্রাজিল, মরক্কো ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে হাইতির আক্রমণের মূল ভরসা হতে পারতেন তিনি।

কিন্তু বিশ্বকাপে খেলার সুবর্ণ সুযোগকে এদুয়ার্দ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে কোনো আবেগের বশে নয়, বরং এক বিরল খেলোয়াড়সুলভ সততায়।

বহু ফুটবলার যেখানে বিশ্বকাপে একটা ম্যাচে মাঠে নামার জন্য ব্যাকুল, সেখানে সম্প্রতি এদুয়ার্দের দেওয়া ব্যাখ্যাটি ছিল ফুটবল বিশ্বের জন্য দারুণ শিক্ষণীয়, ‘না, এই বিশ্বকাপে খেলার কোনো যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাইনি। কারণ, অন্য খেলোয়াড়রা বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে ওঠার জন্য লড়াই করেছে। আর আমি শেষ মুহূর্তে এসে এই বিশ্বকাপে খেলার সুবিধা নিতে পারি না। আমাকে যদি এখানে খেলতেই হয়, তবে তা অর্জন করে আসতে হবে।’