ঢাকা-২০: বিএনপির পুরোনো ভিতের বিপরীতে তারুণ্যের নতুন রাজনীতি

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

ধামরাই থানা রোড সংলগ্ন কমিশনার মোড় এলাকায় জন্ম থেকে বড় হয়েছেন রিনা হিজড়া। এলাকার গ্রামীণ পরিবেশের রূপান্তর দেখেছেন, মাটির রাস্তা থেকে পাকা সড়ক হতে দেখেছেন, মানুষের অবস্থার উন্নতি দেখেছেন। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়নি রিনাসহ এই হিজড়া সম্প্রদায়ের। তাকিয়ে আছেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে।

ষাটোর্ধ্ব রিনা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভোট তো দেব। আগেও দিয়েছি। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা কখনো পাইনি। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেয়ে-চিন্তে আমাদের দিন কাটাতে হয়।’

ধামরাই পৌর এলাকাতেই হিজড়াদের বসবাস। ধামরাই পৌরসভা এবং উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদ মিলে এই ঢাকা-২০ সংসদীয় আসন ঢাকা জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এর উত্তরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, দক্ষিণে নবাবগঞ্জ, পূর্বে সাভার এবং পশ্চিমে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সদর উপজেলা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক চলে গেছে গ্রামীণ পরিবেশের এই আসনের মধ্য দিয়ে।

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পুরো উপজেলা এখন চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থী ও কর্মীরা। বাজারগুলোতে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আলাপ শোনা যায়। নান্নার ইউনিয়নের বাসিন্দা পেশায় কামার সুজন মনি দাস ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও আগের মতো আমেজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রার্থীরা এলাকায় এলাকায় যাচ্ছেন। আমরা জানাচ্ছি এলাকার রাস্তাঘাট ভালো করা দরকার। গরিব মানুষ যেন সাহায্য-সহযোগিতা পায়। এলাকায় যেন মারামারি-সংঘর্ষ না হয়।’

মূলত কৃষিপ্রধান এলাকা হলেও ধামরাই বাজার অনেক পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। এখানে বেশকিছু শিল্পকারখানাও রয়েছে। ধামরাইয়ের যশোমাধবের রথযাত্রা প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। বংশী নদীর তীরের মৃৎশিল্পীদের তৈরি মাটির কাজ ধামরাইয়ের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার কাঁসা ও পিতলের তৈরি তৈজসপত্র ও শিল্পকর্মের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে।

ধামরাই বাজারে প্রায় দুইশত বছরের পুরোনো ব্যবসা সুকান্ত বণিকের পরিবারের। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ধামরাই এমনিতেই শান্তিপূর্ণ জায়গা। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা চলছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন প্রার্থীর লোকজন। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা থমকে আছে। ভোটের পর সরকার গঠন হলে আশা করি পরিস্থিতি ভালো হবে।’

এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে আছেন বিএনপির মো. তমিজ উদ্দিন, জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোট থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ, খেলাফত মজলিসের মো. আশরাফ আলী।

অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—জাতীয় পার্টির আহছান খান, এবি পার্টির হেলাল উদ্দিন আহাম্মদ, বাংলাদেশ জাসদের মো. আরজু মিয়া।

এনসিপি প্রার্থী তরুণ প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ তার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোট চাইছেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে খেতের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। কথা বলছেন ভোটারদের সঙ্গে, তাদের সমস্যা শুনছেন, তার প্রতিশ্রুতির কথা জানাচ্ছেন।

মাঠ পর্যায়ে প্রচারণার সময় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন এবং তার নেতৃত্বকে তারা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন বলে জানান তাসনিদ।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভোটারদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। তারা প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিকে সংসদে দেখতে চায়।’

তার প্রচারণা শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রবীণ, শিক্ষিত সমাজ, শ্রমিক ও কৃষক পরিবারের কাছ থেকেও তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান।

‘নির্বাচিত হলে আমি ধামরাইয়ের জন্য বিশেষ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভোটারদের। প্রতিটি ইউনিয়নে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য উইমেন সেল গঠন করে আইনি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। মেয়েদের স্কুল-কলেজ ড্রপআউট কমাতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেব। মেয়েদের জন্য আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। প্রসূতি মা ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং সরকারি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করব। নির্বাচিত হই বা না হই, ধামরাই নিয়ে আমার গবেষণা ও পরিকল্পনা আছে, এগুলো আমি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাব,’ বলেন নাবিলা তাসনিদ।

বিএনপি প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। তিনিও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায়। তার পক্ষ থেকে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা পুরো ধামরাইয়ের সব এলাকায় এলাকায় ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। দলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের কথা বলে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

ঢাকা জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ধামরাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ধামরাইয়ের প্রতিটি ঘরে আমাদের কর্মীরা যাচ্ছে এবং আমরা মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। দীর্ঘদিন এ দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি, তারা এখন ভোট দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ধামরাইয়ে বিএনপির ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মানুষ এই দলকে নিজের মনে করে ভালোবাসে। ইনশাআল্লাহ, আগামী ১২ তারিখ ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে তাদের প্রিয় প্রতীক ধানের শীষে ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করবেন।’

‘আমাদের প্রার্থী তমিজ উদ্দিন ধামরাইয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ। তিনি তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম বা অবিচারের অভিযোগ নেই। এই স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং ধানের শীষের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বিপুল ভোটে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ধামরাইয়ে নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত অত্যন্ত চমৎকার। প্রচারণায় কারো কোনো বাধা নেই, আমরা সব প্রতিপক্ষের সাথে অত্যন্ত সহনশীল ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করছি। আমরা ১৭ বছর লড়াই করেছি মানুষের এই ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য, তাই জনগণ যাকে বেছে নেবে আমরা তা সানন্দে মেনে নেব।’

এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৯ জন, যার মধ্যে এক লাখ ৮৭ হাজার ৮৩৫ জন পুরুষ, এক লাখ ৮৮ হাজার ৮০২ জন নারী ও দুইজন হিজড়া।