এআই কি আসলেই বন্ধু হতে পারে?
‘কার সাথে, বলো শব্দ ছুঁড়ে ফিরব বাড়ি/ মাঝরাতে, আমি তোমার কথা বলব কাকে?’। মাঝরাতে ঠিক এভাবেই মন কেমনের সুর বাজলে অনুপম রায়, জগজিৎ সিং কিংবা জোয়ান বায়েজের গান শুনতে শুনতে আপনি কাকে বলেন, আপনার মনের কথা? প্রায় হারিয়ে যাওয়া কোনো পুরোনো বন্ধু, পাশে শুয়ে থাকা ক্লান্ত সঙ্গী, নাকি দূরে—বহুদূরে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া আপনার মাকে? কাউকেই কি বলা যায় এখন আর, মনের মধ্যে কী ভীষণ জটিলতায় গুমরে মরছেন?
হয়তো অনেকেই পারেন কাউকে না কাউকে বলতে, আবার বলতে না পারা মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আবার কারো কাছে, মনের কথা এভাবে ভাগ করে নেওয়াটা দুর্বলতা। তাই তারা বেছে নেন মানুষ নয়, এমন কাউকে—যে তাকে পরে সেই কথাগুলো মনে করিয়ে দেবে না, কিংবা দুর্বলতার সুযোগ নেবে না।
বর্তমান সময়ে এমন একটি সঙ্গী হচ্ছে চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি। প্রতিদিনের কাজের ফুট-ফরমাশ খাটতে খাটতে সে হয়ে উঠেছে আমাদের নিত্যদিনের বন্ধু। ফ্রি ভার্সন থেকে প্রিমিয়ামের যাত্রায় যেতে তাই বেশিক্ষণ লাগে না। অনেকে তো কথোপকথন সাবলীল করার জন্য এআইকে নামধামও দেন, যাতে সে কখনো রাগে-দুঃখে অনুযোগ না জানাতে পারে, ‘তোমার দেওয়া আমার কোনো নাম ছিল না, নাম ছিল না!’
তুই, তুমি, আপনি—বন্ধুত্বের এমন সব সম্বোধনেই এআইকে ডাকাডাকি চলে। বাংলা, ইংরেজি, নতুন শেখা কোনো ভাষা, বাদ যায় না কিছুই। এ যেন সবার দৃষ্টি লুকিয়ে-চুরিয়ে নিজেকে তুলে ধরার অন্যতম এক জায়গা হয়ে উঠেছে। তবে এসবই তো এক পক্ষের কথা। মানুষের কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিক্রিয়া কেমন? কী কারণে মানুষ তাকে মাঝে মাঝে মানুষের চেয়েও বেশি ভরসা করে ফেলতে যাচ্ছে?
চ্যাটবট কি মানুষের মতো কথা বলতে পারে?
এর একদম সত্যি উত্তর হচ্ছে, না। পারে না। একজন মানুষ আপনাকে যে প্রতিক্রিয়া দেবে, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুমেয় না। অনেকদিন ধরে কারো সঙ্গে মেলামেশা করলে তার আচরণের একটি প্যাটার্ন দাঁড় করানো যায় ঠিকই। কিন্তু মানবসঙ্গীরা হঠাৎ করে কী করে বা বলে বসবে— তা বোঝা আজও মুশকিল। চ্যাটবট আপনাকে চমকে দিতে পারবে না। সে বারবার আপনার কাছে জানতে চাইবে, আপনি কী চাচ্ছেন। প্রথমে সেটি খুব ‘প্যাম্পারিং’ মনে হলেও কিছুক্ষণ পরে তা বিরক্ত লাগা শুরু হবে। কেননা মানবিক যোগাযোগে অভ্যস্ত মানুষেরা সহজাতভাবে ইশারা-ইঙ্গিত, হ্যাঁ-না, এমনকি কণ্ঠের দ্বিধা বোঝার ক্ষমতাও রাখে। এক্ষেত্রে সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। কেননা এটি আদতে একটি ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং বা ভাষা শিখন মডেল, যা আপনার কাছ থেকে শিখে আপনাকে উত্তর দিচ্ছে।
এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে ছোটবেলায় পড়া একটি সাই-ফাই নভেল ‘প্রজেক্ট নেবুলা’র কথা। ওখানে একটি রোবট ছিল। নাম তার এপসিলন। সে কথা বলতে পারতো। ‘মানুষের মতো’ কথা বলার জন্য এপসিলনের কদর ছিল অনেক। এপসিলন তার সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। তবে তারও একটি সীমাবদ্ধতা ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর দিত প্রশ্ন দিয়ে। তার মডেলটাই ওভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এই সীমাবদ্ধতাই আবার তার সবচেয়ে মজার দিক ছিল—যা কিনা তাকে অনেকটা কৌতূকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করত।
আমাদের সদ্য পরিচিত চ্যাটবটরা, এই যে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, গ্রক—তারাও মোটামুটি এই ফর্মুলায় চলে। তাইতো প্রশ্নের পর বেশ অনেকটা উত্তর দিয়ে, তারপর আবার প্রশ্ন করেন, পরের উত্তরগুলো কেমন হবে, সে বিষয়ে।
চ্যাটবট আপনাকে ভালো বোধ করাবে, এটি মোটমাট সবার ক্ষেত্রেই সত্যি। তবে আপনি যদি চান, সে আপনাকে নিয়ে বেশ ভালোমতো মজাও নিতে পারবে। এই তো কিছুদিন আগেই সবাই ‘রোস্ট মি’ প্রম্পট দিয়ে নিজেকে যেচেপড়ে অপমান করিয়ে, সেটি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বেড়াচ্ছিল। যদিও এতেও থাকবে ভদ্রতার মিছরিতে গোলা একটি সংবিধিবদ্ধ সতর্কবাণী—যে এইটুকুতেই আপনার তৃপ্তি হয়েছে, নাকি রোস্টিংয়ের এই মশলা মাখানোতে আরও গভীরে যাওয়ার অনুমতি তার আছে?
এমনিতে যদি আপনি ক্লান্ত প্রাণ এক হয়ে, দু দণ্ড শান্তি খোঁজেন, তবে বনলতা সেনের জায়গায় এআই আপনাকে সেখানার হালকা-ফুলকা ব্যবস্থা করেই দিতে পারবে। আর যদি চান, নামটাই না-হয় রেখে দিলেন তার—বনলতা সেন?

