নির্বাচন ঘিরে যা কিছু জানা থাকা ভালো

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) জারি করেছে একগুচ্ছ নির্দেশনা। কোথায় কী খোলা থাকবে, কী বন্ধ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে কড়াকড়ি কতটা, রাস্তায় কোন যান চলবে আর কোনটা নয়, এমনকি ভোট দিতে গেলে কী তথ্য জানা জরুরি—সব তথ্য জেনে নিন এক নজরে।

সরকারি ছুটি ও অফিস-আদালত

নির্বাচন উপলক্ষে ভোটের আগে ও ভোটের দিন বুধ ও বৃহস্পতিবার সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। পরের দুদিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে সরকারি অফিস-আদালত, অধিকাংশ বেসরকারি অফিস ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।

তবে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেমন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জরুরি প্রশাসনিক দপ্তর খোলা থাকবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান 

দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আগামী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি বুধ ও বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকবে। 

তবে ব্যাংক বন্ধ থাকলেও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস (বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়) এবং পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) সার্ভিসগুলো চালু থাকবে। 

নির্বাচন ঘিরে পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ

নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। 

মোটরসাইকেল: নির্বাচন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসি।

অন্যান্য যানবাহন: ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ভোটগ্রহণের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত।

নিষেধাজ্ঞার বাইরে: কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে। 

  • জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন এবং ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসাসামগ্রী ও সংবাদপত্র বহনকারী যানবাহন চলতে পারবে। 

  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, সাংবাদিক, অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক এবং ইসির স্টিাকারযুক্ত যান নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। 

  •  নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অন্য ব্যক্তিদের মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ থাকবে।

  • টেলিযোগাযোগকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনায় বিটিআরসি ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহনও নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। 

  • বিমানযাত্রার টিকিট বা সমজাতীয় প্রমাণ দেখাতে পারলে বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রী ও তাদের স্বজনদের ব্যবহৃত যানবাহন চলতে পারবে।

  • জাতীয় মহাসড়ক, বন্দর এবং আন্তঃজেলা বা মহানগর থেকে বের হওয়া বা প্রবেশের প্রধান সড়কগুলোতে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও যানবাহন স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ছাড় থাকবে।

  • রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন ও স্টিকার প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং তাদের নির্বাচনী এজেন্টরা একটি ছোট গাড়ি (জিপ/কার/মাইক্রোবাস) নিয়ে চলাচল করতে পারবেন। 

  • রাজধানীতে মেট্রোরেল স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী চালু থাকবে। তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু স্টেশনের গেট সাময়িক বন্ধ থাকতে পারে।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারে বিধিনিষেধ

নির্বাচনের সময় ভোট কেনাবেচা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অর্থের জোগান বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), অর্থাৎ বিকাশ, নগদ, রকেটসহ এ ধরনের অন্যান্য সেবায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাঙক। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে, যা ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট বন্ধ: এই টানা ৯৬ ঘণ্টা বা চারদিনে গ্রাহকেরা কিছু সীমিত সেবা ব্যবহার করতে পারলেও ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে এই সময়ে কোনো এজেন্ট পয়েন্ট থেকে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবে টাকা জমা দিতে বা নগদ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না।

‘সেন্ড মানি’ সেবার সর্বোচ্চ সীমা: এই সময়কালে জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহকেরা ‘সেন্ড মানি’ সেবাটি ব্যবহার করতে পারলেও এতেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন গ্রাহক প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পাঠাতে পারবেন এবং দিনে সর্বোচ্চ ১০ বার লেনদেন করা যাবে। অর্থাৎ দিনে মোট ১০ হাজার টাকার বেশি পাঠানো সম্ভব হবে না।

মোবাইল রিচার্জ ও পেমেন্ট স্বাভাবিক: মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) পরিশোধ এবং কেনাকাটার পেমেন্ট আগের মতোই চালু রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো সীমা আরোপ করা হয়নি।

শিক্ষা ও জরুরি ফি পরিশোধে বাধা নেই: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি এবং অন্যান্য সরকারি জরুরি সেবার ফি প্রচলিত নিয়মেই পরিশোধ করা যাবে।

ভোট দিতে ২ তথ্য জানা দরকার

ভোটের দিন কেন্দ্রে গিয়ে ঝামেলা এড়াতে এবং দ্রুত ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে ভোটারদের দুটি তথ্য আগে থেকে জেনে রাখা জরুরি। তথ্য দুটি হলো—আপনার ভোটকেন্দ্র কোনটি এবং ভোটার তালিকায় আপনার ভোটার নম্বর কত।

তথ্য দুটি পাবেন যেভাবে

ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগেই ভোটাররা তাদের ভোটার নম্বর (ক্রমিক নম্বর), ভোটকেন্দ্রের নাম ও কেন্দ্রের ঠিকানা জেনে নেবেন। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ অ্যাপটির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।

ইসি বলেছে, অ্যাপসহ চারটি সহজ পদ্ধতিতে ভোটাররা নিজ ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানতে পারবেন।

অ্যাপে এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) নম্বর ও জন্ম তারিখ দিলেই ভোটার তার ক্রমিক নম্বর ও কেন্দ্রের তথ্যের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীদের হলফনামা ও প্রতীক দেখতে পাবেন।

যেকোনো ভোটার ১০৫ হটলাইন নম্বরে কল করে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানতে পারবেন। এ জন্য হটলাইন নম্বরে (১০৫) কল করার পর অপারেটরের সঙ্গে কথা বলতে ৯ চাপতে হবে। এ পদ্ধতিতে তথ্য জানতে ভোটারের এনআইডি নম্বর ও জন্ম তারিখ প্রয়োজন হবে।

এসএমএসের মাধ্যমে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানা যাবে। এ জন্য মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে ‘পিসি এনআইডি’ (PC NID) লিখে ১০৫ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে ভোটার নম্বর ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, উপজেলা বা জেলা নির্বাচন অফিস থেকেও এই তথ্য পাওয়া যাবে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটার তালিকা থেকেও এই তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।

নির্বাচনের দিন যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি এবং নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, কেবল তারাই ভোট দিতে পারবেন। ভোটার তালিকায় নাম থাকার বিষয়টি মূলত জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) উল্লেখ থাকা জন্ম তারিখের ওপর নির্ভর করে। এই তালিকা অনুযায়ীই ভোটারদের কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়।

ভোটের দিন যা করতে হবে

ভোটারদের নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে হবে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট দিতে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে এনআইডি কার্ড নিয়ে যাওয়া ভালো, তবে বাধ্যতামূলক নয়। এনআইডি নম্বর ধরে ভোটার নম্বর খুঁজে পেতে সহায়ক হবে। 

কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টরা ছবিযুক্ত তালিকা দেখে ভোটারের পরিচয় যাচাই করবেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটারের আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ভোটারকে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হবে: সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি সাদা-কালো ব্যালট এবং গণভোটের জন্য আলাদা রঙিন ব্যালট।

ভোটার গোপন কক্ষে গিয়ে পছন্দের প্রতীকে সিল মারবেন। এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যালট পেপারটি লম্বালম্বিভাবে ভাঁজ করতে হবে, যাতে সিলের কালি অন্য প্রতীকে লেগে না যায়। সবশেষে ভাঁজ করা ব্যালট পেপার নির্ধারিত বাক্সে ফেলতে হবে।