ঢাকা-৩

দূষণমুক্ত বাসযোগ্য কেরাণীগঞ্জ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি প্রার্থীদের

সাদী মুহাম্মাদ আলোক, শরীফ এম শফিক

বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে জিনজিরার রহমতপুরে বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন সিনথিয়া আক্তার। ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন এ এলাকায়। এলাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ নিয়ে তার তেমন কোনো অভিযোগ না থাকলেও, সন্তানদের বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত।

দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বেশ আশাবাদী এই নারী উদ্যোক্তা। দ্য ডেইলি স্টারকে সিনথিয়া বলেন, ‘যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হলে আগামী দিনে সবকিছু আগের চেয়ে আরও ভালো হবে। নারীরা যেখানেই কাজ করতে যাক না কেন, কোনো সমস্যায় পড়লে যেন তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক সহায়তা পায়, এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

প্রার্থীদের সম্পর্কে বেশি জানাশোনা না থাকলেও এলাকায় নির্বাচন নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে বলে জানান তিনি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি অবশ্যই ভোট দেবেন এবং ভোটের পর এলাকার সার্বিক উন্নতির প্রত্যাশা করেন সিনথিয়া।

কেরাণীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা, আগানগর, তেঘরিয়া, কোন্ডা ও শুভাঢ্যা—এই ৫ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-৩ আসনে নির্বাচনী আমেজ জমে উঠেছে বেশ। এ আসনের অন্তর্গত আদর্শনগর, ঝিলমিল আবাসিক এলাকা, বাবুবাজার ব্রিজ, হাসনাবাদ, বসুন্ধরা রিভারভিউ, পানগাঁও কনটেইনার ডিপো, জগন্নাথ নিউ ক্যাম্পাস, ইকুরিয়া এলাকায় দিনভর চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। এ এলাকার ওপর দিয়ে গেছে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা রেল সংযোগ।

ঘিঞ্জি পরিবেশ ও সরু রাস্তায় ভরা জিনজিরা ও আগানগর এলাকা মূলত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে শত শত ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠায় কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল ও বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে দূষিত করছে। 

বাবুবাজার ব্রিজ থেকে কদমতলী ও জিনজিরা ফেরিঘাট এলাকায় দিনভর লেগে থাকে যানজট। শুভাঢ্যা খাল ভরে আছে আবর্জনায়। এতে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।

স্থানীয়রা জানান, এই পাঁচ ইউনিয়নে দ্রুত নগরায়ন হলেও কোনো পরিকল্পিত পার্ক বা পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। হাউজিং প্রজেক্টের কারণে জমি ও জলাশয় ভরাট হচ্ছে, তাতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

তারা আরও বলছেন, এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিককালে মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা।

এছাড়া, সম্প্রতি গ্যাস সংকটের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। তারা দ্রুত এর সমাধান চান।

কোন্ডা এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী পল বাবু ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এলাকার প্রধান সমস্যা গ্যাস। আমাদের পুরো এলাকায় গ্যাস সংযোগ নেই। এলাকায় চুরি ও মাদকের সমস্যাও আছে।’

‘সব এলাকাতেই রাস্তাঘাট আছে, কিন্তু সংস্কার কাজ করা দরকার। আশা করি নির্বাচনের পর এলাকার সার্বিক উন্নতি হবে ও পরিস্থিতি আরও ভালো হবে,’ বলেন তিনি।

এ আসন থেকে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০ জন প্রার্থী। প্রচারণার শুরু থেকে তারা বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছেন, কর্মী-সমর্থকরা যাচ্ছেন বাড়ি-বাড়ি, পাড়া-মহল্লায়। ভোট চাচ্ছেন নিজ প্রার্থীর পক্ষে, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এলাকার উন্নয়নের।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহীনুর ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি প্রচারণায় গিয়ে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। এলাকার উন্নয়নে তরুণদের নিয়ে তার বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে।

‘মেধাবীরা যেন ঘুষ ছাড়াই চাকরি পায় তা নিশ্চিত করব। যোগ্যরা সুযোগ পেলে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে। যারা চাকরি পাবে না তাদের জন্য কারিগরি ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের স্বাবলম্বী করতে সরকারিভাবে বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে,’ বলেন তিনি।

কেরাণীগঞ্জের নাগরিক সমস্যাগুলো নিয়েও তিনি কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেন, ‘ধুলাবালি ও ময়লা-আবর্জনার কারণে কেরাণীগঞ্জ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকারভিত্তিতে এলাকার পরিবেশ বসবাস উপযোগী করতে কাজ করব। গ্যাস সংকট সমাধানে অবৈধ লাইন বন্ধ করা হবে এবং সিলিন্ডার গ্যাসের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে। এ ছাড়া, যাতায়াতের ক্ষেত্রে জনগণের কষ্ট লাঘবে উন্নত রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমার অঙ্গীকার,’ বলেন শাহীনুর ইসলাম।

ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘জনগণের অধিকার রক্ষায় যাকে যোগ্য মনে হয়, তাকেই ভোট দেবেন। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আপনারা আপনাদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়ী করুন, যেন ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়া সম্ভব হয়।’

এ আসনে বিএনপি প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জয়ের বিষয়ে ‘শতভাগ আত্মবিশ্বাসী’ বলে জানান। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মাঠে “ধানের শীষের” জোয়ার। জামায়াতের প্রচারণা চলছে গোপনে, মূলত নারী কর্মীদের মাধ্যমে চলছে। কোনো কারচুপি না হলে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

এলাকার সার্বিক উন্নয়নে তিনি একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন করার কথা ভাবছেন। গয়েশ্বর বলেন, ‘কেরাণীগঞ্জে বর্তমানে যে অপরিকল্পিত বাড়িঘর বা সরু রাস্তা হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। ৪০-৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। হাউজিং প্রজেক্টে চওড়া রাস্তা, খেলার মাঠ নিশ্চিত করা হবে। কেরাণীগঞ্জে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল করার পরিকল্পনা আছে। গ্রামের স্কুল-কলেজের মান শহরের পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো যেন সুদূরপ্রসারী হয়, সে বিষয়ে তিনি এখন থেকেই তদারকি করছেন বলে জানান।

এলাকায় গ্যাস সংকট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থার চেয়েও প্রাকৃতিক খালগুলো উদ্ধার করা বেশি জরুরি,’ উল্লেখ করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আগে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এবার কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাকে ভোট দিলে নিজের ও এলাকার ভবিষ্যৎ ভালো হবে তাকেই ভোট দিন।’

এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. সুলতান আহাম্মদ খাঁন, গণঅধিকার পরিষদের মো. সাজ্জাদ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ জাফর, গণসংহতি আন্দোলনের মো. বাচ্চু ভুঁইয়া, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের মজিবুর হাওলাদার, গণফোরামের মুহাম্মদ রওশন ইয়াজদানী, জাতীয় পার্টির মো. ফারুক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মনির হোসেন।

ঢাকা-৩ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ১৫৯, যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭১, নারী ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৪ ও ৪ জন হিজড়া।