টাকা দিয়ে ভোট কেনা জামায়াতের দুর্নীতিবিরোধী বয়ানের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, প্রশ্ন মাহদী আমিনের
দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘যারা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করে, তাদের কাছে প্রশ্ন করা যেতেই পারে, টাকা দিয়ে ভোট কেনা তাদের সেই দুর্নীতিবিরোধী বয়ানের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?’
আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
বিএনপির অনিবার্য বিজয়ের বিপরীতে একটি গোষ্ঠী নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আজ সকালে গণমাধ্যমে দেখতে পেলাম, ঢাকা থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাওয়ার পর নগদ অর্ধ কোটিরও বেশি টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে আটক করেছে পুলিশ।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘টানা চারদিন যেখানে দেশের সব ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ, সেখানে এত বিপুল অর্থ কোন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহার হতে পারে, সেটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্পষ্টতই, আচরণবিধির এই লঙ্ঘন গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলটির দেউলিয়াত্ব ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রমাণ করে।’
জামায়াতকে নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘একই রকম অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনের ঘটনা দেখা গেছে জামায়াতের আমিরের আসন ঢাকা-১৫, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খুলনাসহ দেশের অসংখ্য জায়গায়। এভাবে অবৈধ অর্থ প্রেরণ বা জান্নাতের টিকিটের প্রলোভনকে ধর্মপ্রাণ দেশবাসী ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা, অতর্কিত হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অর্থ বিতরণ করছে। বগুড়া-৪ আসনে নন্দীগ্রামে জামায়াতের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হামলায় থালতা-মাঝগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার চোখের দৃষ্টি হারানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার মা স্ট্রোক করে মারা যান।’
দেশব্যাপী নির্বাচন কমিশন তথা রিটার্নিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।
এছাড়া সুষ্ঠু ভোট প্রক্রিয়া নস্যাতে বোরকা-নিকাবের মতো ইসলামি পোশাকের অপব্যবহার করে মিথ্যা পরিচয়ে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা, লক্ষ্মীপুরে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ সিল উদ্ধারের ঘটনায় একটি প্রিন্টিং প্রেসের মালিক গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মতো ঘটনাগুলো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ বলে আখ্যা দেন তিনি।
নারীদের উদ্দেশে মাহদী আমিন বলেন, ‘এই নির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মীমাংসিত হওয়ার আছে। বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সমাজে কতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত হবেন? কর্মঘণ্টা সীমিত করার মধ্য দিয়ে, মনোনয়ন বঞ্চিত করে, উপর্যুপরি নারীদের অমযার্দাকর ও অশালীন সম্বোধন করে, নারী সমাজে যে অবমাননার চিত্র একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছে, এই নির্বাচন সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর একটি অপূর্ব সুযোগ।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন কেবল ভোটের অধিকার নয়; এই নির্বাচন দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই নির্বাচন শহীদ ও গুম হওয়া প্রতিটি সন্তানের মায়ের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংকল্প। এই নির্বাচন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক।’
বিএনপির জনসমর্থন নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘জনসাধারণের মাঝে বিএনপি জনপ্রিয়তা বরাবরের মতোই শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশেষ করে, গতকাল মঙ্গলবার থেকে লঞ্চ, বাস এবং ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে, যার পক্ষে যেভাবে সম্ভব, ভোটের টানে নিজ-নিজ নির্বাচনী এলাকায় ফিরছেন। এই উৎসবমুখর পরিবেশই নির্বাচনকে ঘিরে গণআকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ।’
নির্বাচন নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আগামীকালের যে নির্বাচন, সেটিতে ইনশাল্লাহ এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যেটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। যেটি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের সাথে ও পাশে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ে ধরে লুণ্ঠিত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এই ঐতিহাসিক সময়ে আমরা প্রতিটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলকে অনুরোধ করব সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে জনগণের মতামতের উপর আস্থা রাখতে, শ্রদ্ধা জানাতে।’
বিএনপির পক্ষ থেকে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, ‘আসুন, সহিংসতা নয়, সবাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করি। বজায় রাখি পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্য। সব ধরনের কারচুপি বা জালিয়াতি রুখে দিয়ে নির্বাচনের যে উৎসবমুখর, স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ ও আজকের গণ-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।’
ভোটারদের উদ্দেশে মাহদী আমিন বলেন, ‘নেতিবাচক রাজনীতি নয়; ইতিবাচক, জনসম্পৃক্ত ও গণমুখী রাজনীতির ভিত্তি হতে পারে যে নির্বাচন, আগামীকাল, তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে ফেরত আসবে, ইনশাল্লাহ। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে আহ্বান জানাই, আপনারা কাল সকালে যত দ্রুত সম্ভব, ভোট কেন্দ্রে আসুন। এই নির্বাচনে বিজয় হোক বাংলাদেশের, এই নির্বাচনে বিজয় হোক বাংলাদেশের মানুষের। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই নিশ্চিত করবে জনগণের ঐক্য, প্রতিষ্ঠা করবে জনগণের রাষ্ট্রীয় মালিকানা।’