সম্পদ গড়তে যে ৭ কৌশল মেনে চলেন ধনীরা
বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, ধনী হতে হলে বড় ব্যবসা করতে হবে, উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক টাকা পেতে হবে কিংবা লটারি জিততে হবে। তবে সম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত সঞ্চয়, আয় বাড়ানোর চেষ্টা ও বিচক্ষণ বিনিয়োগ।
বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা এজন্য কয়েকটি কৌশল মেনে চলেন বলে ফোবর্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
প্রথমে লক্ষ্য ঠিক করা
সম্পদ গড়ার প্রথম ধাপ হলো নিজের লক্ষ্য ঠিক করা। কারও কাছে সম্পদ গড়া বা ধনী হওয়ার অর্থ কোটি টাকার মালিক হওয়া। আবার কারও কাছে এর অর্থ হলো, নিজের বাড়ি থাকবে, সন্তানের পড়ালেখার জন্য টাকা থাকবে, অবসরের পর কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না এবং জরুরি সময়ে ঋণ করতে হবে না।
তাই প্রথমে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন, মাসে কত টাকা আয় করলে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাতে পারবেন, সন্তানের পড়ালেখার জন্য কত টাকা লাগতে পারে, বাবা-মায়ের চিকিৎসা বা পারিবারিক জরুরি খরচের জন্য প্রস্তুতি, অবসরের পর মাসে কত টাকা প্রয়োজন হতে পারে ইত্যাদি।
এরপর নিজের আয় ও খরচের একটি পরিষ্কার হিসাব করুন।
ধরা যাক, মাসে আপনার আয় ৮০ হাজার টাকা। যদি মাস শেষে বুঝতেই না পারেন কোথায় টাকা চলে গেল, তাহলে আয় বাড়লেও সম্পদ গড়া কঠিন হবে।
তাই একটি সহজ নিয়ম হতে পারে, আগে সঞ্চয়, পরে খরচ। অর্থাৎ বেতন পাওয়ার পর সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করে রাখুন। এরপর বাকি টাকা দিয়ে মাসের খরচ চালান।

উচ্চ সুদের ঋণ কমানো
সম্পদ গড়ার পথে ঋণ বড় বাধা হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের ঋণ। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, অতিরিক্ত সুদের ব্যক্তিগত ঋণ বা এমন কোনো ধার, যার সুদ দ্রুত বাড়ছে, এসব আগে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ধরা যাক, আপনি একদিকে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ লাভের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে এমন ঋণ রয়েছে যার সুদ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে কেবল বিনিয়োগের চিন্তা না করে আগে উচ্চ সুদের ঋণ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একটি সহজ কৌশল হলো, যে ঋণের সুদ সবচেয়ে বেশি, সেটি আগে পরিশোধ করুন।

কয়েক মাসের জরুরি তহবিল রাখা
জীবনে কখন কী ঘটে, কেউ জানে না। চাকরি চলে যেতে পারে, ব্যবসায় লোকসান হতে পারে, পরিবারের কারও হঠাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এমন সময়ে হাতে টাকা না থাকলে অনেকেই ধার করেন। আর জরুরি মুহূর্তে নেওয়া ঋণ পরে বড় আর্থিক সমস্যায় পরিণত হয়। তাই ধীরে ধীরে একটি জরুরি তহবিল তৈরি করুন।
আপনার মাসিক প্রয়োজনীয় খরচ যদি ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে প্রথম লক্ষ্য হতে পারে তিন মাসের খরচ, অর্থাৎ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পরে সুযোগ অনুযায়ী সেটি আরও বাড়িয়ে ছয় মাস বা তার বেশি সময়ের প্রয়োজনীয় খরচের সমান করা যেতে পারে।
এই টাকা এমন জায়গায় রাখা ভালো, যেখান থেকে প্রয়োজন হলে সহজে পাওয়া যায় ও ঝুঁকি কম। মনে রাখবেন, জরুরি তহবিলের উদ্দেশ্য লাভ করা নয়; বিপদের সময় নিজেকে ঋণ থেকে রক্ষা করা।

বিনিয়োগ শুরু
সঞ্চয় আপনাকে নিরাপত্তা দেবে, আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেবে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ২৫ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে বিনিয়োগ শুরু করলেন। আরেকজন একই পরিমাণ টাকা নিয়ে ৪০ বছর বয়সে শুরু করলেন। দুজনের বিনিয়োগের পরিমাণ একই হলেও প্রথম ব্যক্তির কাছে সম্পদ বাড়ানোর জন্য বেশি সময় থাকবে।
বাংলাদেশের একজন বিনিয়োগকারী তার লক্ষ্য ও ঝুঁকি অনুযায়ী ব্যাংকে সঞ্চয়, সরকারি সিকিউরিটিজ, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ারবাজার বা অন্য বৈধ বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন।
তবে কোথায় বিনিয়োগ করবেন, তার আগে অবশ্যই খোঁজ-খবর নিতে হবে। যে বিনিয়োগ আপনি বোঝেন না, সেখানে কেবল অন্যের কথায় টাকা রাখবেন না।

সব ডিম এক ঝুড়িতে না রাখা
ধরুন, আপনার সব সঞ্চয় একটি কোম্পানির শেয়ারে। সেই কোম্পানির বড় সমস্যা হলো। তখন আপনার পুরো বিনিয়োগই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। এ কারণেই বিনিয়োগের জগতে একটি পরিচিত ধারণা হলো বৈচিত্র্য।
অর্থাৎ সব টাকা একই জায়গায় না রেখে বিভিন্ন ধরনের সম্পদে ভাগ করে রাখা। ওয়ারেন বাফেটের বিনিয়োগ দর্শন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। তার থেকে বারবার উঠে আসা একটি শিক্ষা হলো, বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে এবং দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে দীর্ঘমেয়াদি।
কেবল খরচ কমাবেন না, আয়ও বাড়ান
ধনী হওয়ার আলোচনায় আমরা সাধারণত সঞ্চয়ের কথা বলি। কিন্তু একটি জায়গায় অনেকেই ভুল করেন, কেবল খরচ কমিয়ে সম্পদ গড়া কঠিন। আয় বাড়ানোর চেষ্টা করাও জরুরি।
আপনি চাকরি করলে নিজের দক্ষতা বাড়ান। নতুন প্রযুক্তি শিখুন, ভাষা শিখুন, পেশাগত প্রশিক্ষণ নিন। নিজের কাজের বাজারমূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করুন। বেতন বাড়ানোর সুযোগ থাকলে নিজের কাজের সাফল্য ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করুন।
প্রয়োজনে নতুন কোনো দক্ষতা শিখুন, অতিরিক্ত কাজ করুন, ফ্রিল্যান্সিং বা বৈধ সাইড-ইনকামের সুযোগ খুঁজুন, ছোট ব্যবসা শুরু করুন, নিজের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে পরামর্শ বা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করুন, প্রয়োজন হলে বেশি সম্ভাবনাময় পেশায় যাওয়ার কথা ভাবুন।

রাতারাতি ধনী হওয়ার ‘ফাঁদ’ থেকে সাবধান
‘এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করুন, এক বছরে পাঁচ লাখ টাকা করুন।’
‘কোনো ঝুঁকি নেই, নিশ্চিত লাভ।’
‘আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেই মাসে লাখ টাকা আয়।’
এ ধরনের কথা শুনলে সাবধান হতে হবে। আর্থিক প্রতারণার অন্যতম বড় হাতিয়ার হলো দ্রুত ও নিশ্চিত লাভের লোভ দেখানো। তাই কেউ যদি বলে ‘এখানে কোনো ঝুঁকি নেই’, তখন প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘তাহলে লাভ এত বেশি কেন?’
ওয়ারেন বাফেটের বিনিয়োগ দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ধৈর্য। ২০২৫ সালের বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের চিঠিতেও তার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, অপেক্ষা ও সঠিক সুযোগের জন্য ধৈর্য ধরার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবকিছু করার দরকার নেই। কখনো কখনো সুযোগের জন্য অপেক্ষা করাও ভালো একটি সিদ্ধান্ত।
আসল কথা হলো, ধনী হওয়ার কোনো সহজ সূত্র নেই। সম্পদ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা, জরুরি তহবিল গড়া, নিয়মিত সঞ্চয় করা এবং ঝুঁকি বুঝে বিনিয়োগ করা।
সূত্র: ফোবর্স, বিজনেস ইনসাইডার, ইনক ম্যাগাজিন

