খুবিতে ছয় ব্যাচের ২৫০ শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ একটি

নিজস্ব সংবাদদাতা, খুবি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এইচআরএম) ডিসিপ্লিনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও ডিসিপ্লিনটিতে এখনো তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে।

ছয়টি ব্যাচের প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি শ্রেণিকক্ষ থাকায় নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

শুধু এইচআরএম নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯টি ডিসিপ্লিনের অধিকাংশেই শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, দেশের অন্যতম শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন সীমিত একাডেমিক অবকাঠামো থাকা হতাশাজনক।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্টুডেন্ট হ্যান্ডবুক অনুযায়ী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯টি ডিসিপ্লিনের আট হাজার ২৩১ শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র ৯৮টি। এর মধ্যে এগ্রোটেকনোলজি; এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স; সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট; হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন; প্রিন্টমেকিং; এডুকেশন ও স্কাল্পচার ডিসিপ্লিনে প্রতিটিতে মাত্র দুটি করে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে এগ্রোটেকনোলজি ও এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে।

একই শ্রেণিকক্ষ একাধিক ব্যাচের ক্লাসে ব্যবহার করতে হওয়ায় একটি ব্যাচের ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য ব্যাচকে অপেক্ষা করতে হয়।

এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর বিন মহিত জানান, তাদের পাঁচটি ব্যাচের ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের ছয়টি প্রোগ্রামের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি শ্রেণিকক্ষ।

‘আমাদের ডিসিপ্লিন গবেষণাসহ বিভিন্ন কাজে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে রিপ্রেজেন্ট করে। সেখানে আমাদের মাত্র দুটি ক্লাসরুম থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। ১১টি প্রোগ্রামের জন্য দুটি মাত্র ক্লাসরুম থাকায় অনেক ব্যাচকে অন্য ব্যাচের ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘গবেষণার জন্য যে ল্যাব ব্যবহার করা প্রয়োজন, অনেক সময় সেখানে থিওরি ক্লাসও করতে হয়। এতে আমাদের গবেষণার কাজও ব্যাহত হচ্ছে।’

এইচআরএম ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী রাহাত কবির জানান, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় তারা বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিসিপ্লিনের দুটি কক্ষ ধার নিয়ে ক্লাস করেন। তাদের কোনো ল্যাবও নেই।

তিনি বলেন, ‘কোনো ল্যাব না থাকায় এইচআরআইএস কোর্স সিলেবাসে থাকার পরও আমরা তা ভালোভাবে শিখতে পারি না। দেশের অন্যতম স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও আমরা যদি এসব শিখতে না পারি, তাহলে এই দায়টা আসলে কার?’

এইচআরএম ডিসিপ্লিনের শ্রেণিকক্ষ সংকটের বিষয়ে ডিসিপ্লিনের প্রধান ড. মেহেদী হাসান বলেন, ‘৪ নম্বর একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিন সেখানে স্থানান্তরিত হবে। এরপর পরিসংখ্যানের বর্তমান কক্ষগুলো এইচআরএমকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।’

তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক শিক্ষার্থী শেখার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। প্রশাসন বা রিসোর্সের অভাবে যেন সেটা ব্যাহত না হয়। শিখনের প্রক্রিয়া শতভাগ নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন, প্রশাসনের তা নিশ্চিত করা উচিত।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য, ডিসিপ্লিনগুলোকে শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রেণিকক্ষ নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা বা স্কয়ারফুট এলাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান জায়গার ব্যবহার পুনর্বিন্যাসের সুযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এস এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ডিসিপ্লিনগুলোকে এরিয়া হিসেবে স্কয়ারফুট জায়গা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এগ্রোটেকনোলজি বা এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের একেকটি ক্লাসরুম অনেক বড়। চাইলে তারা একেকটি ক্লাসরুম পার্টিশন করে সংখ্যা বাড়াতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘৪ নম্বর একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনকে সেখানে স্থানান্তরিত করা হবে। একইভাবে এইচআরএমকেও শ্রেণিকক্ষ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসিন আলী বলেন, ‘ডিসিপ্লিনের ধরন ও একাডেমিক প্রয়োজন বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কৃষিভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্যই এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন খোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত, যে ডিসিপ্লিনের যে প্রকৃতি, সে অনুযায়ী ন্যূনতম সুবিধা দেওয়া, যাতে শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত হয়।’

২৯টি ডিসিপ্লিনে মোট ৯৮টি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা, ব্যাচ ও একাডেমিক প্রোগ্রামের তুলনায় এই অবকাঠামো কতটা পর্যাপ্ত, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ডিসিপ্লিনগুলোতেও যখন শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা দুটির মধ্যে সীমিত, তখন দীর্ঘমেয়াদে একাডেমিক অবকাঠামো পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন ভবন, স্থান পুনর্বিন্যাস এবং বড় শ্রেণিকক্ষ ভাগ করে এ সমস্যা সমাধানের কথা বলছে। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, শুধু শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা নয়, প্রতিটি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী সংখ্যা, ব্যাচ, একাডেমিক প্রোগ্রাম ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে শ্রেণিকক্ষ এবং অন্যান্য একাডেমিক সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।