প্রায় ২ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ, ঢাবি শিক্ষক সমিতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেই
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চললেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেই।
শিক্ষকদের অনেকে বলছেন, শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত কমিটি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে হয়রানি, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরার কার্যকর কোনো প্ল্যাটফর্ম তারা পাচ্ছেন না।
তাদের অভিযোগ, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা ছাড়াই তথ্য অনুসন্ধান কমিটি, তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এতে এসব কার্যক্রমের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হয় এবং সভাপতি পদে মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিনাত হুদা নির্বাচিত হন। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, মেয়াদকাল থাকে এক বছর। সে হিসাবে নির্বাচিত এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নতুন কার্যকরী পরিষদ গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চলতি পরিষদ কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ১৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি, কোষাধ্যক্ষ, যুগ্ম সম্পাদকসহ মোট ১১ জন সভাপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরও আগে একজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন, একজন মারা গেছেন এবং আরেকজন দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। ফলে বর্তমানে কার্যত সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদাকে নিয়েই শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম চলছে।
শিক্ষক সমিতির ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, এই সমিতির মূল লক্ষ্য হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান ও সুনাম বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষা, ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা এবং প্রশাসন ও শিক্ষা-গবেষণায় গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারা অব্যাহত রাখা। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য সমুন্নত রাখা, শিক্ষকদের শিক্ষাগত, পেশাগত ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা।
সমিতির নির্বাচনের বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জিনাত হুদা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনে বিলম্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সক্রিয় শিক্ষক সংগঠনগুলো দায়ী। এই নির্বাচন কেন হলো না, সেটার জবাব দেবেন নিয়াজ সাহেব, সেটার জবাব দেবেন ওবায়েদ সাহেব, সেটার জবাব দেবে সাদা দল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তো নির্বাচন দিতে বাধ্য, তাই না? এটার তো এক বছরের মেয়াদ। এই নির্বাচনটা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে যেকোনো একটি তারিখে ঘোষণা করতে হবে। এটা ঘোষণা করে কে? এটা অবশ্যই শিক্ষক সমিতি ঘোষণা করে, প্রশাসন ঘোষণা করে এবং প্রত্যেকটা অ্যাক্টিভ দল—অর্থাৎ নীল, সাদা বা অন্য যারা, একসময় গোলাপি ছিল—তারা সবাই মিলেই এটা করে।’
বারবার সাবেক ভিসি নিয়াজ আহমেদ খান ও বর্তমান ভিসি এবিএম ওবায়েদুল ইসলামকে নির্বাচন দেওয়ার জন্য বলেছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে থাকা সবাই সাদা দলের শিক্ষক। তবুও কেন শিক্ষক সমিতিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন ফোরাম ও পদে নির্বাচন হচ্ছে না? দুই বছর হয়ে গেছে। সেই দুই বছরের মধ্যে একমাত্র ডাকসু ছাড়া একটি নির্বাচনও তো হয়নি। ডিন নির্বাচন, সিন্ডিকেট নির্বাচন দিলেন না; শিক্ষক সমিতির নির্বাচন দিলেন না। এখন তো এসব নিয়মনীতি আসলে কিছুই মানে না।’
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন সাদা দলের বেশ কয়েকজন শিক্ষক। তাদের ভাষ্য, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের প্রতি অনাগ্রহের অন্যতম কারণ হলো, ভোটের সমীকরণ ও পরাজয়ের আশঙ্কা।
তাদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এক হাজারের বেশি শিক্ষক মূলত নীল দলের সমর্থক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক নীলপন্থী শিক্ষকের উপস্থিতির কারণে নির্বাচনে সাদা দলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা কঠিন।
ঢাবি শিক্ষক সমিতির গত পাঁচটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবারই আওয়ামীপন্থি নীল প্যানেল নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হয়েছে। ২০১৯, ২০২১ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে নীল দল ১৫টি পদের মধ্যে ১৪টিতে জয়ী হয়। আর, ২০২০ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে সাদা দল অংশ না নেওয়ায় নীল দল সব পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সভাপতি পদে ২০২২ সালের নির্বাচনে নীল প্যানেলের প্রার্থী ৮১৯ ভোট পেয়ে ৪৩৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এর আগে ২০২১ সালে ৯৪৫ ভোট পেয়ে ৫৫৩ এবং ২০১৯ সালে ৯৩৩ ভোট পেয়ে ৪৯৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল নীল দল।
একইভাবে সাধারণ সম্পাদক পদে ২০২২ সালের নির্বাচনে নীল প্যানেলের প্রার্থী ৭১২ ভোট পেয়ে ১৩১ ভোটের ব্যবধানে, ২০২১ সালে ৯৭০ ভোট পেয়ে ৫৮৯ ভোটের ব্যবধানে এবং ২০১৯ সালে ৭২৯ ভোট পেয়ে ৮৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৩টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউটে মোট শিক্ষক প্রায় ২ হাজার৷
বিএনপিপন্থি সাদা দলের শিক্ষকরা বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে প্রায় এক হাজার আওয়ামীপন্থি ও নীল দলের অনুগত শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে প্রশাসন। তবে এ বিষয়ে কোনো সমন্বিত হিসাব নেই।
সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক এবিএম ওবায়েদুল ইসলাম ভিসি হওয়ার পর গত জুলাই মাসের সিন্ডিকেট সভায় ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব নিয়োগ পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
তবে, এই সময়ে মোট কতজন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে তা জানতে চাইলে পর্যালোচনা কমিটির প্রধান প্রো-ভিসি আবদুস সালাম জানান, এখনো তারা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাদা দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘বিষয়টি নিঃসন্দেহে সত্য এবং আমার অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই যে, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনের উদ্যোগ না নেওয়ার পেছনে ভোটের ব্যাপারটি রয়েছে। বিগত আওয়ামী আমলে যেভাবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, সমিতির নির্বাচনসহ সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বের হয়ে আসা কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক সমিতি ও সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন নিয়ে এখনো কিছু ভাবছে না। সবাই তো ভালো আছে, শুধু শুধু একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার তো কোনো মানে হয় না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে যে কমিটি করা হয়েছে, আমার জানামতে এখন পর্যন্ত ৮০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।’
তবে, তার এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিরুদ্ধে অনির্বাচিত, আওয়ামী লীগ সরকারকে অব্যাহত সমর্থন প্রদান এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল সমর্থক শিক্ষকরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেন এবং শিক্ষক সমিতিকে প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর জামায়াতপন্থী শিক্ষক, বামপন্থী শিক্ষক ও নীল দলের বিতর্কহীন জুনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন একটি অ্যাডহক কমিটি করতে চেয়েছিল সাদা দল। কিন্তু, আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে মূল সংকট তৈরি হয় পদমর্যাদা নিয়ে। পদ নিয়ে এই টানাটানির কারণে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা ভেস্তে যায়।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে সাদা দলের আরেকজন শীর্ষ শিক্ষক নেতা বলেন, সমিতির নির্বাচন নিয়ে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ‘ফ্র্যাঙ্কলি বলি, এখানে জামায়াত, বাম দল সবাই মিলে বসে একটা সর্বদলীয় কমিটি করার কথা ছিল। কিন্তু অমুক পদ, তমুক পদ ভাগাভাগি করতে গিয়ে আর কাজটা হয়নি। কেউ সভাপতি হতে চায়, কেউ সেক্রেটারি হতে চায়—এসব কারণেই শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি।’
তিনি বলেন, ‘তারপরও আমি আমার দলকে পরামর্শ দিয়েছি, যতটুকু ছাড় দেওয়া সম্ভব দিয়ে সবাই মিলে যেন অন্তত একটা অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। একক কোনো কমিটি যেন না হয়। অ্যাডহক কমিটি হলে টিচার্স লীগ, জামায়াতসহ অ্যাসোসিয়েশনের সবাইকে নিয়েই করতে হবে।’
‘যারা জুনিয়র লেভেলে আছে, তারা তো দেখতেই পাচ্ছেন কেউ জামায়াতে যাচ্ছে, কেউ টিচার্স লীগে যাচ্ছেন, আবার কেউ সাদা দলে চলে আসছে। কিন্তু যারা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জোর করে নীল দল করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা একদম ব্ল্যাকলিস্টেড, অর্থাৎ যারা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, তারা হাজার চেষ্টা করলেও নীতিগতভাবে কাউকে নেওয়া উচিত নয়। আমরা তাদের কোথাও কোনো অ্যাক্সেস দেবো না’, যোগ করেন তিনি।
সাদা দলের আহ্বায়ক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘আমরা একটা কমিটি করার চিন্তাভাবনা করছি। সেটা কীভাবে করব, সেটা এখনো দল সিদ্ধান্ত নেয়নি। যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, দেখি কিছু করা যায় কি না। অ্যাডহক ভিত্তিতে কিছু একটা হবে আপাতত। তারপরে নির্বাচন ডিসেম্বরে। এরকম হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই পরবর্তীতে সব জায়গায় এখনো ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস করা যাচ্ছে না। সব নির্বাচন আটকে আছে। ডিন চলছে অ্যাক্টিং দিয়ে, সবকিছুই তো অ্যাক্টিং দিয়ে চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ১০০০ শিক্ষক রেখে গেছে। নির্বাচন হবে কীভাবে? আওয়ামী লীগ আমলে গত ১৫ বছরে তো শুধু দলীয়ভাবে নীল দলের অনুগত শিক্ষকদের রিক্রুট করে গেছে প্রশাসন।’
‘আমার তো মনে হয় নির্বাচন হলে কোনো একক দল জিতবে না। নীল দল হিসেবে পারবে না, কিন্তু ওরা অন্য কোনো ব্যানারে নির্বাচন করার চেষ্টা করবে’, যোগ করেন তিনি।