কেনিয়ায় সফল পরীক্ষা: সূর্যের আলোয় চলবে অ্যাম্বুলেন্স, প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছাবে স্বাস্থ্যসেবা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

কেনিয়ার বারিঙ্গো কাউন্টির প্রত্যন্ত সিলালে গ্রামের এক মা তার সন্তানদের টিকা দিতে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্লিনিকে যান। দুর্গম ও পাথুরে রাস্তায় মোটরসাইকেলে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি যাতায়াতের খরচও অধিকাংশ পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক টিকাদান জোট ‘গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেনিয়ায় নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতেও অন্তত সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। শুধু তাই নয়, ম্যানডেরা, গ্যারিসা ও ওয়াজিরের মতো কিছু এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে যেতে হয়।

এ ছাড়া, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দিতে নতুন একটি যান তৈরি করেছেন নেদারল্যান্ডসের একদল শিক্ষার্থী। যানটির নাম স্টেলা জুভা।

সৌরশক্তিচালিত এই অ্যাম্বুলেন্সে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসাউন্ড এবং টিকা ঠান্ডা রাখার জন্য ফ্রিজসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। এর ছাদে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যা চলন্ত অবস্থাতেও ব্যাটারি চার্জ করতে পারে। পাশাপাশি যানটি থামিয়ে রাখলে বাড়তি চার্জের জন্য ভাঁজ করে রাখা সোলার প্যানেল দুই পাশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

নেদারল্যান্ডসের আইন্ডহোভেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং আরও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৩ শিক্ষার্থীর একটি দল এই অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করেছে। দলটির নাম ‘সোলার টিম আইন্ডহোভেন’।

তাদের দাবি, স্টেলা জুভা ‘বিশ্বের প্রথম সৌরশক্তিচালিত অ্যাম্বুলেন্স’।

এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টেলা জুভা প্রচলিত অ্যাম্বুলেন্সের মতো নয়। এটি একটি চলন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো কাজ করে। রোগীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার পরিবর্তে এটি প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সেগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিয়ে হাজির হয়।

চলতি মাসে কেনিয়ার অ্যামরেফ হেলথ আফ্রিকার সঙ্গে যৌথভাবে যানটির পরীক্ষা করেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার অংশ হিসেবে ৮০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কেনিয়ার মসিরো গ্রামে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও যান শিক্ষার্থীরা। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না।

সোলার টিম আইন্ডহোভেনের ভাষ্য মতে, স্টেলা জুভা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে কাজ করেছে। দলের ২২ বছর বয়সী সদস্য ইসাবেলা ওয়ানিনজেন বলেন, ‘আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছি।’

অ্যামরেফ হেলথ আফ্রিকার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জন কুটনা বলেন, ‘মসিরোর মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুতের অভাবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন সন্তানসম্ভবা নারীরা।’

এসব এলাকায় সৌরশক্তিচালিত অ্যাম্বুলেন্সটি বেশ কাজে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

শিক্ষার্থীরা জানান, এই পরীক্ষায় তারা দেখতে পান, চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানোর মতো পর্যাপ্ত শক্তি ব্যবহারের পরও বাড়তি বিদ্যুৎ জমা রয়েছে স্টেলা জুভায়।

তাদের দাবি, প্রচলিত জ্বালানি বা চার্জিং অবকাঠামোর সঙ্গে সংযোগ ছাড়াই যানটি স্বনির্ভরভাবে কাজ করতে পারে।

সোলার টিম আইন্ডহোভেন ও অ্যামরেফ হেলথ আফ্রিকার হিসাব অনুযায়ী, দুই দিনে প্রায় ২০০ জন মানুষকে চিকিৎসা দিতে পারবে এই অ্যাম্বুলেন্স।

পরীক্ষা শেষে আবার নেদারল্যান্ডসে ফিরিয়ে নেওয়া হবে স্টেলা জুভাকে। তবে শিক্ষার্থীরা চান, এই ধারণাটি যেন এখানেই থেমে না থাকে।

দলের ২৩ বছর বয়সী সদস্য ইয়ার্নো বাস্টেন বলেন, ‘স্টেলা জুভার মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের কিছু সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে চাই আমরা।’

যেভাবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সোলার টিম আইন্ডহোভেন। এক বছর মেয়াদি এই প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য টেকসই যানবাহন তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছে, ‘স্টেলা ভিটা’ এবং বিশ্বের প্রথম অফ-রোড সৌরচালিত যান ‘স্টেলা টেরা’ তৈরি করা।

ক্যাম্পারভ্যান হলো এমন একটি ছোট যান, যেটিকে থাকার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এতে ঘুমানোর জায়গা, ছোট রান্নাঘর, টেবিল, চেয়ার এবং টয়লেট বা গোসলের ব্যবস্থা রয়েছে। একে ভ্রাম্যমাণ আবাসনযানও বলা যায়। আর অফ-রোড সৌরচালিত যান হল এমন একটি গাড়ি, যা দুর্গম পথে চলতে পারে এবং সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চালিত হয়।

দলটির কয়েকটি প্রকল্প ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সাফল্যও পেয়েছে।

চলতি বছর সোলার টিম আইন্ডহোভেনের সাবেক পাঁচ সদস্য জাপানি গাড়ি নির্মাতা নিসানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সোলার চার্জিং প্রযুক্তিসম্পন্ন ডেমো বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেছেন।

কেনিয়ার মতো দেশে এ ধরনের অ্যাম্বুলেন্স তৈরি বা ব্যবহারের পথে বড় বাধা হলো অর্থায়ন। তবে কেনিয়ার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অ্যাম্বুলেন্সটির সফল পরীক্ষা আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এটি কেনিয়ার শিক্ষার্থীদের স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবনে উৎসাহিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় সৌরশক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।

অ্যামরেফ হেলথ আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ কেনেডি ওয়াকোলি বলেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সৌরশক্তি কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, সৌরশক্তি সব জায়গায় রয়েছে।’

তিনি আশা করেন, স্টেলা জুভা এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখবে।

তার মতে, দেশটি এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে কীভাবে একে কাজে লাগানো যায় সেটা ভেবে বের করা জরুরি।