কৃষি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সই অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিয়েছে
ইতিহাস বলে বেশিরভাগ সময় কৃষি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সই ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। যখন বিশ্বের বেশিরভাগ অর্থনীতি করোনাভাইরাসের একের পর এক ঢেউয়ে সরবরাহ ঘাটতি ও নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি সমস্যায় ভুগেছে, তখন এই ৩টি উপাদান ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ২০২১ এর মধ্য দিয়ে দেশকে পরিচালনা করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বলেন, 'কৃষি খাতের উৎপাদন শক্তিশালী থাকায় আমরা কোনো খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হইনি। রেমিট্যান্সের প্রবাহ আমাদের স্থিতিশীলতা দিয়েছে এবং এই অর্থ গ্রামগুলোতে পৌঁছানোর কারণে সার্বিকভাবে ভোগ বেড়েছে।'
অর্থনীতির আরেকটি চালিকাশক্তি হচ্ছে ক্রমবর্ধমান তৈরি পোশাকের রপ্তানি। জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
দেশে করোনাভাইরাস মহামারি আঘাত হানার পর সরকার সাহসিকতার সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করার কারণেই অর্থনীতিতে তারল্য রয়েছে।
'তারল্যের কারণেই ভোগ বেড়েছে', যোগ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, রপ্তানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রশংসনীয় পর্যায়ের উপকার করেছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহও বেশ কাজে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, 'কৃষি খাতও বেশ সহনশীল ছিল। এটি আমাদের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করছে।'
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন কৃষি খাত শুধু স্থিতিশীলতাই দেয়নি, সঙ্গে নিরাপত্তাও দিয়েছে।
'খাবারের কোনো সংকট ছিল না', বলেন তিনি।
তিনি জানান, মহামারি যখন তুঙ্গে তখন রপ্তানি অর্ডারের সংখ্যা একেবারে কমে গিয়েছিল। তবে ২০২০ এর আগস্ট থেকে আবারও অর্ডারগুলো ফিরে আসতে শুরু করে।
'প্রণোদনা প্যাকেজ, তারল্য সহযোগিতা ও দরিদ্রদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, তবে তা যথেষ্ট ছিল না', যোগ করেন তিনি।
ই-কমার্স খাতও ভালো করছে, জানান ফাহমিদা।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত ৫ মাসে রপ্তানি খাতে ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। আমদানিও ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, 'তবে আমরা বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারিনি। এটি আগামী দিনগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।'
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন জানান, কৃষি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের পাশাপাশি টিকাদান (করোনাভাইরাসের) কর্মসূচি চালু করা ছিল অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পেছনে আরেকটি মূল নিয়ামক।
করোনাভাইরাস সংক্রান্ত মাল্টিলেটারেল লিডার্স টাস্ক ফোর্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ করোনাভাইরাসের ২ ডোজ ও ৫২ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে ১ ডোজ টিকা পেয়েছেন। এই টাস্ক ফোর্সটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর টিকা পাওয়া ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়ার একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ।
'ফলে দেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে ফিরে গেছে', যোগ করেন মঞ্জুর।
তিনি জানান, নির্মাণ খাতও মহামারির মধ্যে বেশ ভালো করেছে।
বস্তুত আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা এ বছর প্রায় ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করেছেন। ভোক্তারা মহামারির মন্দাকে কাটিয়ে উঠেছেন এবং সরকারও আবাসন খাতে বিনিয়োগের বিনিময়ে অঘোষিত সম্পদের বিপরীতে কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতাকে মওকুফ করেছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, সব খাতে পুনরুদ্ধারের হার সমান নয়।
'তবে আমরা যদি সার্বিকভাবে অর্থনীতির কথা বলি, তাহলে বেশ ভালো পরিমাণ পুনরুদ্ধার হয়েছে', জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, যদি রপ্তানি খাত ভালো করে, তাহলে এর সঙ্গে সংযুক্ত অনেক খাতও ভালো করবে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) কান্ট্রি ইকোনমিস্ট নাজনীন আহমেদ এই পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাইকেই কৃতিত্ব দিতে চান।
তিনি বলেন, 'সবাই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন। সব খাতই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।'
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, আউটসোর্সিং ব্যবসা, ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানও দেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অবদান রাখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান জানান, লকডাউনের সময়টুকু বাদ দিলে উৎপাদন খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমও ভালো হয়েছে।
তিনি বলেন, 'এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহামারি-পূর্ব পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।'
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, ধারাবাহিক স্থানীয় চাহিদা ও ক্রমশ বাড়তে থাকা রপ্তানির কারণে ফার্মাসিউটিক্যাল খাত ভালো করছে।
তিনি বলেন, 'পরিবহন ও খুচরা বিক্রয়ের মতো খাতগুলোও ভালো করতে শুরু করেছে।'
তবে কিছু উদ্বেগের বিষয় রয়েছে।
নাজনীন জানান, বড় ব্যবসা ও শিল্প খাত যেভাবে সরকারের সহায়তায় পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে, অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো অর্থায়নের দিক দিয়ে সেরকম সুযোগ পায়নি।
'এ কারণে পুনরুদ্ধারের হার কিছু ধীর', বলেন তিনি।
শ্রম বাজার প্রসঙ্গে তিনি জানান, এক দল মানুষ আছেন যারা কম দক্ষ, কম শিক্ষিত ও যাদের বয়স কিছুটা বেশি। তারা চাকরির বাজারে ফিরে আসতে সমস্যায় পড়ছেন।
বিআইডিএসের একজন জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো কাজী ইকবাল জানান, সেবা খাত এখনো মহামারি-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে যেতে পারেনি।
তিনি বলেন, 'তবে ভালো দিক হচ্ছে পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।'
তৌফিকুল জানান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন কেন্দ্রের পুনরুদ্ধার অন্যান্য ব্যবসার তুলনায় ধীর গতিতে হচ্ছে।
আরেকটি হুমকি হচ্ছে ঋণ দেওয়ার হারের প্রবৃদ্ধি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানো। এর মূল কারণ হচ্ছে এখনো কিছুটা অনিশ্চিত অবস্থা থাকার কারণে বিনিয়োগের পরিমাণ খুব বেশি বৃদ্ধি না পাওয়া।
অর্থনীতির জন্য আরেকটি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, যেটি নভেম্বর মাসে এর আগের ১৩ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পৌঁছিয়েছিল।
মঞ্জুর জানান, সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আতিউর রহমান বলেন, 'মূল্যস্ফীতি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমাদের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি সামান্য পরিমাণে বাড়লেও, যদি প্রবৃদ্ধি ঠিক রাখা যায়, তাহলে ট্রেড-অফ খুব একটা খারাপ হবে না।'
অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান