দেনায় জর্জরিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

By শাহনেওয়াজ খান চন্দন, শাহীন মোল্লা

পটুয়াখালীর একটি দুর্গম গ্রাম থেকে আসা বাসুদেব ভেবেছিলেন তিনি তার পরিবারের জন্য ঢাকায় আরামদায়ক জীবন যাপনের সব আয়োজন করে ফেলেছেন।

রাজধানীর ভাষানটেক এলাকায় তিনি একটি চুল কাটার সেলুন পরিচালনা করতেন। স্থানীয়দের মধ্যে জনপ্রিয় আড্ডার জায়গা ছিল তার সেলুন। গত বছরের ২৪ মার্চ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ২ সপ্তাহের জন্য সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করার পর তার ব্যস্ত সেলুনে নীরবতা নেমে আসে। 

সরকার বাসুদেবের মত ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যাতে তারা মহামারির মন্দার সময়টা পার করতে পারেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় বাসুদেবের মতো প্রকৃতই যাদের এই সুবিধা প্রয়োজন, তারাই এর সুফল ভোগ করতে পারেননি।

প্রণোদনা বঞ্চিত বাসুদেব তার সেলুন বাঁচাতে উচ্চ সুদে ঋণ নেন, যে ঋণের দায়ে তিনি এখন স্থানীয় মহাজনের দোসরদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

তারা হুমকি দিয়েছেন, আড়াই লাখ টাকা ফেরত দিতে না পারলে, তারা তার বউ ও বাচ্চাকে তুলে নিয়ে মহাজনের ইটের ভাঁটায় দাসের মতো কাজ করতে বাধ্য করবে।

বাউফল উপজেলায় নিজের বাসা থেকে ফোনে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাসুদেব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমি আর কী করতে পারতাম?'

বাসুদেবের গল্পের মতো অনেক গল্প ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শোনা যায়। 

গত জুলাই মাসে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এর পরিচালিত একটি নিরীক্ষায় ৭৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মালিকরা জানিয়েছেন মহামারির সময় তাদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা এখনো পুনরুদ্ধার করতে পারেননি।

মাত্র ৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রণোদনা প্যাকেজ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ঢাকার গাউসুল আজম মার্কেটের বিছানার চাদর ও বালিশ ব্যবসায়ী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, 'এসব প্রণোদনা আমাদের জন্য নয়।'

প্রণোদনা বঞ্চিত এবং দেনার দায়ে জর্জরিত আমজাদ তার দোকান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বেঁচে থাকার জন্য তাকে দোকানের সব মালামাল বিক্রি করে দিতে হয়। এখন তিনি বাস টার্মিনালে ঘুরে ঘুরে তৈজসপত্র ফেরি করেন।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, 'নিয়তি এটাই ছিল যে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্রদের জন্য তৈরি করা প্রণোদনা প্যাকেজ তাদের কাছে পৌঁছাবে না, কারণ এই উদ্যোক্তাদের কাছে তহবিলের আবেদন জানানোর জন্য কাগজপত্র নেই।'

কুটির, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে থাকে এরকম বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধিরা। তাদের প্রত্যেকেই কাগজপত্র না থাকার কথা উল্লেখ করেন, যেটির কারণে শুধুমাত্র প্রণোদনা প্যাকেজই নয়, সব ধরণের আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে দেশের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের হেড অব এসএমই মোহাম্মদ সাইফুদ্দৌলা শামীম বলেন, 'ঋণ বিতরণের সময় আমরা জানতে পারি অসংখ্য ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স, টিন সনদ, আয়কর রিটার্নের মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। তাদেরকে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করতে হবে।'

শামীম যোগ করেন, সরকারের উচিত একটি কেন্দ্রীয় রিপোজিটরি সিস্টেম চালু করা, যেখান থেকে উদ্যোক্তারা একবারে সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন।

দুর্দশাগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সরকার কী উদ্যোগ নিয়েছে জানতে চাওয়া হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বকসী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা পাঠিয়েছে। যারা এই প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পেতে চান, তাদেরকে নীতিমালা মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে হলে আপনাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলতে হবে।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং মুখপাত্র সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন, সিএমএসএমই (কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতের জন্য নির্ধারিত প্রণোদনা তহবিলের বেশিরভাগ অংশ মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান পেয়েছে।

প্রণোদনা তহবিল পেতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে কিছু কাগজপত্র অবশ্যই থাকতে হবে, যা বেশিরভাগের কাছেই থাকে না।

সিরাজুল যোগ করেন, 'আমরা এসএমই ফাউন্ডেশানের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িতরা সব কাগজপত্র সঙ্গে রাখার প্রয়োজনীয়তা ও সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হয়।'

এসএমই ফাউন্ডেশনের সভাপতি মাসুদুর রহমান জানান, তারা ৮টি আঞ্চলিক মেলার আয়োজন করেছেন, যেখানে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসার উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং সেবা ও কাগজপত্র জোগাড়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন।

ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দুর্দশা থেকে বের করে আনতে তাদেরকে নগদ অর্থ প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেন রায়হান।

তিনি বলেন, '৫ রাউন্ড ধরে নিরীক্ষা চালালেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্যাকেজ পাওয়ার জন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা কোনো উন্নতি দেখতে পাইনি।' এ ধরণের জরুরি তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জন্য সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণের শেষ ২টি পর্যায়ে এসএমই ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র ১ লাখ এসএমইকে তহবিল দিতে পেরেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে ৭৮ লাখেরও বেশি এসএমই আছেন। রায়হান এই সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, 'এছাড়াও, আমাদেরকে তহবিল বিতরণের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে, যেটি ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের জন্য বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া।'

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণের কাজের সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাদের (এনজিও) সংশ্লিষ্ট করার সুপারিশ করেন। 

যেসব এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কাজ করছে, তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাতে পারে। সুতরাং তারা চাইলে সেসব এলাকার ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছেও প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণ করতে পারবে, জানান তিনি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের মতে, সরকারের পরিকল্পনা যেটাই হোক না কেনো, তাদের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া, কারণ ২০ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাসুদেবের মত ভাগ্য বরণের আশঙ্কায় রয়েছে।

কমপক্ষে ৪০ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেনার দায়ে জর্জরিত। উপায়ন্তর না দেখে তারা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে এই ঋণ নিয়েছেন।

হেলাল বলেন, 'সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগের কাছেই পৌঁছায়নি এবং ব্যাংকগুলোও তাদেরকে ঋণ দেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখায়নি।'

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান