ফেলনা থেকে হস্তশিল্প, মাসে রপ্তানি আড়াই কোটি টাকার পণ্য
গাজীপুর থেকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকার হস্তশিল্প পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয় খেজুর পাতা, হোগলা পাতা, তাল পাতা, পাট, বেত, বাঁশ, কাশফুলের গাছ, কাঠসহ নানান ধরনের লতাপাতা।
উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে ঝুড়ি, টেবিলম্যাট, ছোট-বড় থলে ইত্যাদি। রপ্তানি পণ্যগুলো যাচ্ছে ৩২টি দেশে। এর মধ্যে আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া উল্লেখযোগ্য।
প্রায় ৩ হাজার ২০০ শ্রমিক দেশের ৮ এলাকার উপশাখাগুলোয় এসব পণ্য তৈরি করছেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৮০০ জন নারী। কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও লোকবলের সহজপ্রাপ্তির ভিত্তিতে উপশাখাগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা
২০১৫ সালে বিজেএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন টেকনোলজি (বিইউএফটি) থেকে পড়াশুনার শেষদিকে তরুণ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানকে প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে বলা হয়। সহপাঠীরা টেক্সটাইল, গার্মেন্টসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির কাজ শুরু করেন। তিনি চিন্তা করেন একটু ব্যতিক্রম কিছু।
দেশে হস্তশিল্পের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাবনা নিয়ে খোঁজ শুরু করেন মেহেদী। অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির পাশাপাশি এ শিল্পের বৈশ্বিক বাজার এবং সম্ভাবনা তাকে ভাবিয়ে তোলে। অ্যাসাইনমেন্টের কাজ শেষ হতে না হতেই হস্তশিল্পে নতুন কিছু করার ইচ্ছা জাগে তার।
টিউশনির জমানো টাকায় যাত্রা শুরু
মেহেদী হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকেই টিউশনি শুরু করি। শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যন্ত টিউশনি করেছি। সেখান থেকে পাওয়া বেতনের টাকা থেকে কিছুটা জমাতাম। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার আগে টিউশনির মোট ৮০ হাজার টাকা ছিল আমার কাছে। তা দিয়েই যাত্রা শুরু।'
আরও বলেন, 'এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো ঋণ নিইনি। ব্যবসায়ের মুনাফা থেকেই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রসারণ করেছি, জনবল বৃদ্ধি করেছি।'
এভাবেই যাত্রা শুরু হয় নেচার ক্রাফট বাংলাদেশ লিমিটেডের।
নিয়ন্ত্রণ
দেশব্যাপী এই প্রতিষ্ঠানের ৮টি উপশাখা রয়েছে। প্রধান কারখানা গাজীপুরের ধীরাশ্রমে। সেখানে আছে ৩টি ইউনিট। ময়মনসিংহ, যশোর, সাতক্ষীরা, বগুড়া, নরসিংদী ও টাঙ্গাইলে আছে একটি করে শাখা। গাজীপুর থেকেই সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
'পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কুটির শিল্পের সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরা এবং এই শিল্পকে প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার লক্ষ্যে কাজ করছি,' যোগ করেন মেহেদী হাসান।
দেশে চাহিদা
বিদেশ থেকে এসব পণ্যের যে পরিমাণ চাহিদা আছে তা দেশে নেই উল্লেখ করে উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, 'দেশে ২-১টি পণ্য নেওয়ার সৌখিন ক্রেতা পাওয়া যায়। তবে, বিপুল পরিমাণে পণ্য কেনার বাজার এখনও গড়ে উঠেনি।'
তিনি জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ ফুটের ২টি কন্টেইনারে নিয়মিত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাইরে। মাসের বিভিন্ন সময় ক্রেতাদের অর্ডার বেড়ে গেলে এ সংখ্যা ৩ বা ৪ কন্টেইনারও হয়। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে এসব পণ্য পৌঁছে যায় ৩২টি দেশে।
নতুনদের অগ্রাধিকার
মেহেদী হাসান আরও জানান, এক সময় দেশব্যাপী হস্ত ও কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার ছিল। চাহিদা না থাকায় এ শিল্প স্বাভাবিক গতি পায়নি। এখনও যে কয়েকটি হস্ত ও কুটির শিল্প রয়েছে সেগুলোতে সাধারণত বয়স্কদের কাজ করতে দেখা যায়।
তরুণদের এই পেশায় কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'তৈরি পোশাক শিল্পে একজন শ্রমিক তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী যে পরিমাণ বেতন-ভাতা পান, হস্ত ও কুটির শিল্পে সমপরিমাণ শ্রম দিয়ে সমপরিমাণ উপার্জন করতে পারবেন। বাড়তি সুবিধা হিসেবে দূষণমুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারবেন।'
প্রশিক্ষণ ও বেতন-ভাতা
শুরুতে মেহেদী হাসান নিজেই শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন অভিজ্ঞ শ্রমিকরা পর্যায়ক্রমে নতুনদের প্রশিক্ষণ দেন। তৈরি পোশাক ও সোয়েটার কারখানাগুলোর মতোই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়।
ওভারটাইমের জন্য শ্রমিকদের রয়েছে বাড়তি প্রণোদনা। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নিয়মিত কাজ চলে। এরপর শ্রমিকেরা তাদের ইচ্ছা মতো ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম করতে পারেন।
প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়।
পেশা পরিবর্তন
২০১৫ সালে শুরু হলেও ২০১৬ সালের শেষ দিকে এই কাজটিকে পেশা হিসেবে নেন মেহেদী। এর আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেখানে যে শ্রম, সময় ও মেধা দিতে হতো তা দিয়ে মানুষের জন্য আরও বেশি কিছু করা সম্ভব বলে মনে হয় তার।
সেই চিন্তা থেকেই আরও ২০ জনকে নিয়ে ভালো থাকার প্রত্যয়ে গাজীপুরে প্রথম কারখানা স্থাপন করেন মেহেদী।
প্রথম ক্রেতার গল্প
মেহেদী বলেন, 'আমার অ্যাসাইনমেন্ট দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান বার্ষিক উৎসবে এর একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের চান। ওই প্রেজেন্টেশনটি দেশ-বিদেশের অনেকেই দেখেন। সেখানে একজন জাপানি ছিলেন। আমার কারখানার জন্য যখন কাগজপত্র করছিলাম, সেই সময় থেকেই তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।'
'২০১৭ সালের প্রথম দিকে ৪টি মেশিনে কারখানার প্রথম উৎপাদন শুরু হয়' উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'ওই জাপানি প্রথম ৩০টি পণ্যের অর্ডার দেন। প্রথমেই বেশ ভালো মূল্য পাই। পরে বিভিন্ন দেশে হস্ত ও কুটির শিল্পের মেলায় আমার পণ্য পরিদর্শন করি। সেখান থেকে আমাদের একাধিক ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। এরপর এখন ইন্টারনেটে অর্ডার সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজ করি।'
ঝুঁকি
'করোনা প্রায় সব ব্যবসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করলেও আমাদের জন্য ছিল উল্টো,' বলছিলেন মেহেদী। তার মতে, 'বহু দেশ চীন থেকে হস্ত ও কুটির শিল্পের পণ্য সংগ্রহ করত। কিন্তু মহামারির কারণে তারা চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের একটি বিরাট অংশ আমার কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ শুরু করে। করোনার মধ্যে বেশ ভালো ব্যবসা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধাবস্থার কারণে কয়েকটি দেশ পণ্য নিতে পারছে না। কিন্তু, এতে আমাদের লোকসান হয়নি, শুধু রপ্তানি সামান্য কমেছে।'
শ্রমিকদের কথা
প্রায় ২ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন লিপি আক্তার। তার স্বামী আব্দুর রশীদ রিকশা চালান। আগে তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন লিপি।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তৈরি পোশাক কারখানার মতো বেতন-ভাতা একই নিয়মে পাই। বাড়তি সুবিধা হিসেবে খোলা পরিবেশ কোনো চাপ ছাড়া কাজ করি। দুশ্চিন্তামুক্ত থেকে কাজে মনোনিবেশ করা যায়।'
শ্রমিক ইতিমণি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পাই। বাবা-মার সংসারে সহযোগিতা করে নিজেও কিছু সঞ্চয় করি।'
অপারেটর ঝর্ণা ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রায় ২ বছর হচ্ছে এখানে চাকরি করছি। মাসের প্রথম দিনেই বেতন পাই। ওভারটাইমসহ প্রতিমাসে প্রায় ১৬ হাজার টাকা পাই।'
অপারেটর মঞ্জুরুল আলম ও কাইউম মিয়াদের কাছেও শুনতে পাওয়া যায় একই কথা।
অপারেটর সালমান ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি সারাদিনে ১০০ থেকে ১২০টি ঝুড়ি তৈরি করতে পারেন।
সরকারি সহায়তা
তৃণমূলে অনেক উদ্যোক্তা আছেন। নানা কারণে তারা সামনে এগোতে পারছেন না। কারখানা অধিদপ্তর থেকে কারখানা স্থাপনে অনুমতি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) ইত্যাদি পাওয়া আরও সহজ ও ঝামেলা মুক্ত হলে তৃণমূলের উদ্যোক্তারা সাহস পাবেন। উদ্যোক্তার সংখ্যাও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
আগে ২০ শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়া হতো। সেটি কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই ইনসেনটিভ ৩০ শতাংশ।
ফেলনা জিনিস দিয়ে অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা
খেজুর পাতা, হোগলা পাতা, তাল পাতা, বেত, বাঁশ, কাশফুলের গাছ ইত্যাদি দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ফেলনা জিনিস বলে গণ্য হয়। অথচ, এসব দিয়েই পাট ও সুতার বন্ধনে মূল্যবান জিনিসপত্র তৈরি হচ্ছে।
বাড়িতেও কাজ করেন অনেকে
দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা উপশাখায় বেশ কিছু পণ্যের ফিনিশিংয়ের কাজ নারীরা বাড়িতে বসেই করে থাকেন। পণ্যের সংখ্যার হিসাবে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। সংসার দেখাশোনার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করতে পারেন তারা।