বাড়তি চাহিদায় বেড়েছে তালিকাভুক্ত ফার্মা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা
করোনা ভীতি থেকে মুক্ত হয়ে আবারও বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা গ্রহণ এবং ব্যাংকের অর্থায়নের খরচ কমে যাওয়ায় ফার্মা পণ্যের বিক্রি বেড়েছে। ফলে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রায় প্রতিটি তালিকাভুক্ত বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান আগের চেয়ে বেশি মুনাফা করেছে।
বাংলাদেশের প্রধান ১০টি ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বেড়েছে। এগুলো হলো—এসিআই লিমিটেড, একমি ল্যাবরেটরিজ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ইবনে সিনা, রেনাটা, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ইনফিউশন এবং ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস।
তবে, ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস ও সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালসের আয় কমেছে।
বাংলাদেশে করোনা মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ে ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসা কিছুটা চাপের মুখে পড়ে। গত বছর মার্চে এই সংকট দেখা দিলেও এটি তুঙ্গে ওঠে এ বছরের প্রথম কয়েক মাসে। কারণ, সেই সময় মানুষ অতি জরুরি না হলে হাসপাতালে যেতে চাইতেন না।
একইভাবে, অনেক ডাক্তারও তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ায় চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরেছে। এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মহিবুজ জামান বলেন, 'এতে করে ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ও মুনাফা বেড়েছে।'
তাদের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসের মূল প্রতিষ্ঠান এসিআই লিমিটেডের মুনাফা প্রথম প্রান্তিকে ৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা হয়েছে, যা এক বছর আগের একই সময়ের চেয়ে ৬৪৭ শতাংশ বেশি। গত বছর প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয় ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান একই মত পোষণ করে বলেন, 'এ বছর প্রায় প্রতিটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক সময়ের ১০ থেকে ১২ শতাংশ মুনাফা প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি পেয়েছে।'
এসিআই লিমিটেডের শেয়ার প্রতি আয় এক বছর আগের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১৫৫ শতাংশ বেড়েছে। একমি ল্যাবরেটরিজের মুনাফা ৪১ শতাংশ, ইবনে সিনার ৩৯ শতাংশ, বেক্সিমকো ফার্মার ৩৬ শতাংশ এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মুনাফা ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
মনিরুজ্জামান বলেন, 'তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদকদের প্রবৃদ্ধির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বাড়তি বিক্রি।'
অসংখ্য মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় ভাইরাস সংক্রান্ত ওষুধের চাহিদা অনেক বেশি ছিল।
রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশ থেকে ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যের চালান জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, যার নেপথ্যে আছে করোনাভাইরাস নিরোধক ওষুধ এবং সরকারের কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক প্রণোদনা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত ৩ মাসে ৫৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার।
গত বছরের এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব খাতের জন্য ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করে দেওয়ায় মুনাফার হার বেড়েছে বলে মনে করেন মনিরুজ্জামান।
ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের জন্য জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সময় এবং এই সময়ে সন্তোষজনক মুনাফা অর্জিত হয়েছে বলে জানান রেনাটার কোম্পানি সচিব মো. জুবায়ের আলম।
রেনাটা ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৩৯ কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১২৬ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী থেকে জানা যায়, সব তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তাদের শেয়ার প্রতি আয় সবচেয়ে বেশি ছিল, যার পরিমাণ ১৪ দশমিক ১৯ টাকা।
গত বছর মহামারির কারণে অনেক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রেখেছিলেন, যা ওষুধের বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে। এখন তারা সশরীরে রোগী দেখছেন।
জুবায়ের বলেন, 'এখন সব চিকিৎসক সশরীরে রোগী দেখছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। এ কারণে আমাদের বিক্রি বেড়েছে।'
তিনি জানান, চিকিৎসকরা সাধারণত রোগীদের খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের ওষুধ সেবনের উপদেশ দেন।
গত বছর ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের স্থানীয় বাজারের আকার প্রায় ২৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ছিল। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে।
ইউসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের একটি গবেষণা অনুযায়ী, এক দশকের মধ্যে এই বাজার বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা হতে পারে।
দেশে প্রায় ২০০ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে এবং তারা বিশ্বের ১৫১টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি রপ্তানি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে, যা ২০২১ অর্থবছরের অর্জন ১৬৯ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি।
অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান