লোকসানে জর্জরিত ঐতিহ্যের তাঁত, একে একে বন্ধ হচ্ছে কারখানা
পাবনার জালালপুর তাঁতিপাড়ার একসময়ের প্রতিষ্ঠিত তাঁত কারখানার মালিক বুলবুল হোসেন। ইতোমধ্যে তিনি তার ৪০টি তাঁতের প্রায় সবগুলো বিক্রি করে দিয়ে বিশাল তাঁতের ঘর ফাঁকা করছেন। কারণ তাকে ব্যবসা পরিবর্তন করতে হবে।
বুলবুল দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কারখানা চালালে তাকে দুই দফায় লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে। চড়া দামে সুতা ও রং কিনে কাপড় তৈরি করে লোকসান দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে হবে। একইসঙ্গে লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। সে কারণে কারখানা বিক্রি করে লোন পরিশোধের পাশাপাশি নতুন ব্যবসার চেষ্টা করতে হচ্ছে তাকে।
একই এলাকার তাঁত ব্যবসায়ী আজিজুল হাকিম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তার ২৪টি তাঁতের মধ্যে ইতোমধ্যে ১২টি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ১২টি তাঁত কোনোরকমে চালাতে হচ্ছে লোকসান দিয়েই। তাঁত কারখানার পাশে একটি মুদি দোকান খুলে জীবিকার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন তিনি।
আজিজুল বলেন, 'করোনার কারণে প্রায় এক বছরের বেশি সময় লোকসান দিয়ে কারখানা চালু রেখেছিলাম। করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ার পর নতুন আশায় বুক বেঁধে ব্যবসা শুরু করে সীমাহীন লোকসানে এখন পৈত্রিক ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছি।'
জালালপুর তাঁতিপাড়া এলাকার সর্বত্রই এখন একই অবস্থা। ক্রমাগত লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে তাঁত কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁতিরা। পাবনার অন্যতম বৃহত্তম তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা জালালপুরের ৫ হাজার তাঁতের মধ্যে এখন মাত্র দেড় থেকে ২ হাজারের মতো তাঁত চলছে।
অধিকাংশ প্রান্তিক তাঁতি ইতোমধ্যে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বড় ব্যবসায়ীরা অর্ধেকের বেশি তাঁত বন্ধ রেখে কোনোরকম তাদের কারখানা চালু রেখেছেন। তবে যেকোনো সময় বন্ধ হতে পারে পুরো তাঁত।
তাঁত শ্রমিক মো. শান্ত দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি যে কারখানায় কাজ করেন, সেখানে ৩৪টি তাঁতের বেশীরভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক শ্রমিক। মাত্র কয়েকজন শ্রমিক এখন ১৩টি তাঁত চালাচ্ছেন। তবে মালিক বলেছেন, 'আগামী মাস থেকে এগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে'। তাঁতগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে পড়ার পর কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এই দরিদ্র তাঁত শ্রমিক।
তাঁতিরা জানান, করোনা পরবর্তী তাঁত কারখানা চালু করার পর গত ৩-৪ মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সুতার দাম। সুতার দাম ইতোমধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে বাড়ছে রং, কেমিক্যালসহ তাঁত কারখানার সব কাঁচামালের দাম। তাঁতের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি তাঁত কাপড়ের দাম। এ অবস্থায় লোকসান দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছেন না তাঁতিরা।
তাঁতিরা জানান, বর্তমানে প্রতি পাউন্ড ৮০ কাউন্ট সুতা বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা। অথচ কয়েক মাস আগে এই সুতার দাম ছিল মাত্র ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। একইভাবে প্রতি পাউন্ড ৬০ কাউন্ট সুতা বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। যা কয়েক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। এ ছাড়া, প্রতি পাউন্ড ৪০ কাউন্ট সুতা বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। যা কয়েক মাস আগেও বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা।
করোনা পরবর্তী গত কয়েকমাসে সুতার দাম কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে এখন নাগালের বাইরে চলে গেছে। সুতার দামের পাশাপাশি রংয়ের দাম বেড়েছে প্রায় দিগুণ। ৫ হাজার টাকার চীনা রং এখন ৯ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
তাঁতিরা জানান, মাত্রাতিরিক্ত দামে সুতা, রং কিনে কাপড় তৈরি করতে বাজার মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁতিরা।
তাঁতিরা জানান, বর্তমানে ৮০ কাউন্ট সুতার এক থান তাঁতের কাপড় (৪টি লুঙ্গি) তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা।
সুতার দাম ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও কাপড়ের দাম বেড়েছে থান প্রতি মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা।
তাঁতের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া ও তাঁত কাপড়ের উৎপাদন খরচ বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাঁত কারখানাগুলো। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ক্ষুদ্র শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মো. হায়দায় আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দেশের অন্যতম বৃহত্তম তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ৬ লাখ তাঁতের মধ্যে এখন প্রায় ৪ লাখ তাঁতই বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাকি তাঁতগুলো যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।'
তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সুতার দাম হু হু করে বাড়ছে। পাশাপাশি সুতার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র কয়েকটি আমদানিকারক অ-স্পিনিং মিল। ফলে প্রান্তিক তাঁতিদের স্বার্থ সংরক্ষণ হচ্ছে না।'
দেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র শিল্প (তাঁত শিল্প) রক্ষার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।