সিরাজগঞ্জ শিল্প পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বাড়ছে

By আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম শিল্প পার্ক। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিসিক যমুনার তীর ঘেঁষে ৪০০ একর জায়গার উপর দেশের বৃহত্তম এ শিল্প পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে দফায় দফায় সময় ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময়ে শিল্প পার্ক নির্মাণ এখনও অনিশ্চিত।

নির্ধারিত অতিরিক্ত সময়ে বহুল আলোচিত এ প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় আবারও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিসিক। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসার প্রসার ঘটার পাশাপাশি দুই লাখেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে বিসিক সূত্র।

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে ৩৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে যমুনার তীরে শিল্প পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে কোনো কাজই হয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্পটি প্রথম দফায় সংশোধন করে ৪৮৯ কোটি ৯৬ টাকা প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তবুও কাজ শুরু হয়নি।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৬২৮ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়। এ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও প্রকল্পের সময় গড়িয়ে যাওয়ায় তৃতীয় দফায় প্রকল্পের ব্যয় ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা নির্ধারণ করে প্রকল্পের সময় ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করতে বলা হয়।

তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজের আশানুরুপ অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্পের সময়সীমা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ পর্যায়ে অবশ্য ব্যয় বাড়ানো হয়নি।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত অতিরিক্ত সময় শেষ হতে চললেও প্রকল্পের কাজের এখনও অনেকটাই বাকি। প্রকল্প কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াও প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হতে পারে।

তবে বার বার প্রকল্পের মেয়াদকাল ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কবে নাগাদ প্রকল্পের সুফল বয়ে আনবে তা এখনও অনিশ্চিত।

দফায় দফায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রকল্পের মেয়াদকাল বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্প পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল খালেক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সময়মতো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে না পারায় প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেরি হয়েছে।'

প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০০ একর জমি ২০১৪ সালে বিসিক বুঝে পায়, এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন, নদী তীরবর্তী হওয়ার কারণে নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদন এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করতে অনেকটা সময় চলে যায়।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, 'সকল অনুমোদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে ২০১৮ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ মাঠে গড়ায়। বিশাল এলাকা মাটি ভরাটের কাজের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত শিল্প পার্কের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।'

প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেরি হওয়ায় সমসাময়িক বাজার দরের সঙ্গে মিল রেখে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ফলে কয়েক দফায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

প্রকল্প পরিচালক আব্দুল খালেক বলেন, 'ইতোমধ্যে প্রকল্পের কাজের ৭৩ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রকল্পের আর্থিক কর্ম সম্পাদন হয়েছে ৬৩ শতাংশ। প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে আরও বেশ কিছু সময় লাগবে সেহেতু প্রকল্পের সময়কাল আরও এক বছর বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।'

তবে এখন প্রকল্পের কাজ সিংহ ভাগ এগিয়ে গেছে ফলে এ পর্যায়ে সময় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পের ব্যয় আর বাড়ানো হবে না বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে, প্রকল্পের অফিস নির্মাণ শেষ পর্যায়ে এখন চলছে প্রকল্পের মধ্যে ১৭ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও ৩৪ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের কাজসহ ১২ ধরনের কাজ।

বিসিক কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৮২৯টি শিল্প প্লট পাওয়া যাবে যেখানে বিনিয়োগকারীরা আমদানি ও রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারবে।

সিরাজগঞ্জ বিসিকের সহকারি ম্যানেজার সাজিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রকল্পটি পরিপূর্ণভাবে কাজ শুরু করলে প্রায় দুই লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে যা এ অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভুমিকা রাখবে।'

সিরাজগঞ্জ শিল্প পার্কে গ্যাস, বিদ্যুৎ, যোগাযোগের সুব্যবস্থা থাকায় বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়গে অনেক বেশি আগ্রহী। এছাড়া সিরাজগঞ্জ শিল্প পার্কে গড়ে তোলা হবে একটি সবুজ বেষ্টনী, যার ফলে আগ্রহ বিনিয়োগকারীদের বাড়বে বলে জানান তিনি।  

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্দাস্ত্রিজ এর সভাপতি অবু ইউসুফ সূর্য দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সিরাজগঞ্জের শিল্প পার্ক শুধু এ জেলার আর্থিক বিকাশেই ভুমিকা রাখবে না পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়িক প্রসারে বিরাট ভুমিকা রাখবে।'

তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা হওয়ায় এখানে তাত শিল্পের জন্য বিনিয়গের সুযোগ সৃষ্টির আহবান জানান তিনি।

বিসিক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর আগামী বছর থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া শুরু হতে পারে। খুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের শিল্প পার্কে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবে বলে জানান তারা।