সৌরশক্তি ও বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় উদ্যোগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বড় আকারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২২৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার ৫টি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে গতকাল।
ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো মূলত চীনা প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে বাস্তবায়িত হবে। সরকার প্রকল্পগুলো থেকে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে।
এই অনুমোদনের নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা। এই পরিকল্পনার বিস্তারিত হালনাগাদ ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জাতিসংঘের 'জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষ সম্মেলন কপ-২৬' এ জমা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভা গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্জ্য-ভিত্তিক ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছে।
সরকার চীনের কানভেস এনভায়রনমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ১৭ দশমিক ২০ টাকা মূল্যে ২৫ বছর ধরে কিনবে।
বাংলাদেশে কানভেসের প্রধান সমন্বয়কারী শাহীন কবির খান জানান, এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি ইনসিনারেশন বা ভস্মীকরণ প্রযুক্তির ভিত্তিতে নির্মাণ করা হবে এবং অন্যান্য বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের চেয়ে এর খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে।
সিটি করপোরেশন প্রতিদিন এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে নগরবাসীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা আড়াই হাজার টন মিশ্র আবর্জনা সরবরাহ করবে।
এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত খরচ ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, যেটি কানভেস বহন করবে।
শাহীন বলেন, 'এটি পরিবেশবান্ধব হবে এবং পরিবেশের সুরক্ষা দেওয়ার পেছনে বিনিয়োগের ৪০ শতাংশ ব্যয় করা হবে।'
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার এই বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।
১ ডিসেম্বর ঢাকার আমিনবাজারে দেশের প্রথম বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়।
এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে।
ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় আরও দুটি বর্জ্য-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মিত হবে। এ ধরনের বেশ কিছু প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিপিডিবির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন বিপিডিবি কর্মকর্তা। মন্ত্রিসভা ৩টি সৌরশক্তি চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে।
বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি হচ্ছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (নওপাজিকো) ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের মধ্যে একটি যৌথ অংশীদার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান পাবনার সুজানগরে একটি ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে।
এই কেন্দ্র থেকে সরকার ২০ বছর ধরে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) ৮ দশমিক ৪৮ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে।
একই প্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় আরেকটি ৬৮ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করবে, যেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য সরকারের ইউনিট প্রতি ৮ দশমিক ১৬ টাকা খরচ হবে।
সিঙ্গাপুরের সাইক্লেস্ট এনার্জি পিটিই লিমিটেড চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় একটি ৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে। এখান থেকে সরকার প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ১৬ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে।
ভোলার মনপুরা উপজেলায় ওয়েস্টার্ন রিনিউয়েবল এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড একটি সৌর ব্যাটারি ও ডিজেলভিত্তিক হাইব্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করবে, যার উৎপাদন সক্ষমতা ৩ মেগাওয়াট। সরকার এখান থেকে প্রতি ইউনিট ২১ দশমিক ২৫ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নজর দেওয়ার বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিষয়ে তিনি বলেন, 'এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে, কারণ এর ব্যবস্থাপনা করা খুবই কঠিন কাজ। এছাড়াও এ ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে।'
তিনি যোগ করেন, 'তবে নির্মাণ করার জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই যত্নশীল হতে হবে যাতে তা স্থানীয় সম্প্রদায় কোনভাবে প্রভাবিত না করে। পরিবেশের ওপর এ ধরনের উৎপাদন কেন্দ্রের প্রভাবকে আমলে নিতে হবে।'
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৭৭ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৩ শতাংশের মতো।
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছে সরকার, কারণ এ ধরনের উৎস থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া পাইপলাইনে আছে।
এ মুহূর্তে মোট ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৯টি সৌরবিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে এবং একটি বায়ু শক্তিতে চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আরও ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হবে।
এছাড়াও আরও ১২টি সৌরবিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ শুরু করার জন্য চুক্তি হতে যাচ্ছে, যেগুলো থেকে মোট ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। আরও কিছু বায়ু ও বায়োম্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, 'সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বেশ ভালো অগ্রগতি দেখিয়েছে এবং বর্তমান অর্থবছরের মধ্যেই এই খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে।'
অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান