উৎসবের আমেজে ক্লাসে ফিরলেন সারা দেশের শিক্ষার্থীরা
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ৫৪৩ দিন বন্ধ থাকার পর চালু হয়েছে সারাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজ রোববার সারা দেশে প্রথম দিনের ক্লাসে উপস্থিত হওয়া শিক্ষার্থীদের শারীরের তাপমাত্রা মেপে ও স্যানিটাইজড করে ক্লাসে প্রবেশ করানো হয়।
জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর মতে, বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী মহামারির এ সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরে ছিল।
দীর্ঘদিন পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্য দেখা গেছে এক ধরনের উচ্ছ্বাস। স্কুল খোলার প্রথম দিনে দেশের কয়েকটি জেলার স্কুলগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে এই প্রতিবেদন।
গাজীপুরে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার উপহার দিয়ে শিক্ষার্থীদের বরণ
আজ রোববার সকাল থেকেই গাজীপুরের বিভন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। শিক্ষার্থীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক বিতরণ শেষে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে স্কুলে বরণ করে নিতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যান।
গাজীপুর সদর উপজেলার কোণাবাড়ী, বাঘেরবাজার, ভবানীপুর, শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
কোনাবাড়ী কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুল আহসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন,'মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠ নিতে এসেছি। এখানে শিক্ষক এবং বন্ধুসহ বেশিরভাগেরই নতুন মুখ। কলেজের প্রবেশমুখে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র দিয়ে শরীরের তাপ মেপে ও স্যানিটাইজার স্প্রে করা হয়েছে।'
গাজীপুর সদর উপজেলার আবাবিল একাডেমির প্রধান শিক্ষক খায়রুজ্জামান তুহিন বলেন,'দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ক্যাম্পাস। শ্রেণিকক্ষ আবারও আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। আমরা আবার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পঠন-পাঠনে অংশ নিতে পারছি।'
দীর্ঘদিন পর স্কুলে ফিরে দারুন খুশি বরিশালের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
বরিশালের বিভিন্ন স্কুলে আজ শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে স্কুলগুলো জানানো হয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রবেশ করার আগে বাধ্যতামূলকভাবে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরাতে হয়।
প্রথম দিনে বরিশাল বিভাগের প্রাথমিকের ১০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেছে। মাধ্যমিকেও উপস্থিতির হার ছিল প্রায় একই। স্কুলগুলোর বেঞ্চে বসার জন্য দাগ দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়। দীর্ঘদিন পর স্কুলে ফিরতে পেরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও দারুন খুশি ছিল।
পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, দীর্ঘদিন পর স্কুলে আসতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। তবে, ওই শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, 'দীর্ঘদিন পর স্কুলে আসার খুশিতে তার ছেলে রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারেনি।'
বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহবুব হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শিক্ষার্থীদের পাঠদান প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।'
টাঙ্গাইলে প্রায় শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ
টাঙ্গাইলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। প্রায় শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে সশরীরে পাঠদান শুরু হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপার পর প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করানো হয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর আগে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া মাহমুদা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অনেক দিন পর স্কুলে এসে খুব আনন্দ লাগছে। স্কুল খুলে দেওয়ায় আমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।'
বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক তাহমিনা বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন,'শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।'
চাঁদপুরে শ্রেণিকক্ষে বরণ করে নেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের
চাঁদপুরের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়লসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
এ সময় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে স্যানিটাইজড করে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট দূরুত্ব বজায় রেখে শ্রেণিকক্ষগুলোতে ক্লাস নিতে দেখা গেছে।
তবে, ব্যতিক্রম দেখা চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে। সেখানে কলেজ অধ্যক্ষ মাসুদুর রহমানসহ অন্যান্য শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে কলেজে উপস্থিত প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীকে বরণ করে নেন। ৎ
এছাড়া, তাদের নিয়মিত ক্লাসে আসা ও প্রতিটি ক্লাসে মনোযোগী হওয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে নির্দেশ দেন কলেজ অধ্যক্ষ।
রাজবাড়ীতে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো
শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল রাজবাড়ীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমরেশ চন্দ্র বিশ্বাস দ্য ডেইলি স্টার কে জানান, আজ বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ।
এদিকে রাজবাড়ীতে বন্যার কারণে ২১টি বিদ্যালয়ে পাঠদান নিয়ে শঙ্কা ছিল। বন্যা পরিস্থিতি ভালো হওয়ায় রাজবাড়ীর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই হচ্ছে পাঠদান।
আলহাদীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আন্জুমান আরা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন,'তার স্কুলে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থত ছিল।'
জেলা শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন,'বন্যার পানি ঢুকে যাওয়ায় রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলার ২১টি বিদ্যালয় পানিবন্দী হয়ে পড়ে। এখন বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় সবগুলো স্কুলে ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।'
কুষ্টিয়ায় শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে স্কুলগুলোতে ছিল নানা আয়োজন
কুষ্টিয়ার বেশকিছু স্কুল তাদের শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে নানা আনুষ্ঠানিকতাও পালন করে। সরকারি জেলা স্কুলে ও গার্লস স্কুলে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রধান ফটকে ফুল ও বেলুন দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবস্থা রাখা হয় হাত ধোয়ার। শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুলে প্রবেশ করে।
রোববার সকালে কুষ্টিয়া সরকারি জেলা স্কুল ও গার্লস স্কুলে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান জেলা প্রশাসক ও স্কুলের সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।
তিনি বেশ কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের যথাযথ নিয়ম মেনে স্কুলে ক্লাস করার আহবান জানান।
শহরের কয়েকটি বিদ্যালয়ে পরিদর্শন করে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস থাকলেও বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে কাঙিক্ষত পরিমাণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই।
সচেতনতার বার্তা নিয়ে প্রাণ ফিরেছে রংপুর ও দিনাজপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
স্কুলের পোশাক পরে রিকশা, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে শিক্ষার্থীরা পৌঁছায় প্রিয় শিক্ষাঙ্গনে। তাদের মুখে ছিল মাস্ক, ব্যাগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। বহুদিন পর স্কুলে ফেরায় তাদের বরণ করে নেন শিক্ষকরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অভিভাবকরাও মেতে ছিল খোশগল্পে।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রংপুর শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, প্রচণ্ড রোদ-গরম উপেক্ষা করেই শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ছিল আনন্দের রেশ। চেহারায় ছিল খুশির ঝিলিক। অনেকদিন পর বন্ধু-সহপাঠীদের মধ্যে ছিল দেখা হবার আনন্দ। অনেককেই জড়ো হয়ে গল্প করতে দেখা গেছে।
তবে, মুখে মাস্ক পরা ছাড়াও করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে তাদের সতর্ক থাকতে দেখা যায়।
দীর্ঘদিন পর স্কুলে ফিরতে পেরে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে ইরা বলেন,'খুব ভালো লাগছে। কতদিন বাসায় ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়নি। আজ স্কুলে এসে আমি আনন্দিত। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, গল্প করব। স্কুলের দোলনায় খেলা করব।'
সফুরা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের আয়া জমিলা খাতুন বলেন,'আমরা খুব আনন্দিত। অনেকদিন পর একসঙ্গে সবাইকে দেখতে পারছি। আমি আজ দেড় বছর পর ঘণ্টা বাজালাম। ছোট ছোট বাচ্চাদের চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। আমাদের স্কুলের সব স্যার-ম্যাডাম টিকা নিয়েছেন। আমি চাই স্কুল খোলা থাকুক।'
প্রথম দিনে কম উপস্থিতি ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনিহা দেখা গেছে পাবনায়
দীর্ঘদিন পর স্কুল খুললেও উপস্থিতি কম ছিল পাবনার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। জেলার বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই স্কুলে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী আবার নির্ধারিত ক্লাস না থাকলেও গিয়েছিল স্কুলে।
পাবনা আলিয়া মাদ্রাসা প্রাইমারি স্কুলের চতু্র্থ শিক্ষার্থী মিলি খাতুন দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, অনেক দিন স্কুল বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন পর স্কুল খোলায় সে স্কুলে যায়। তবে, সেখানে গিয়ে জানতে পারে তার নির্ধারিত কোনো ক্লাস ছিল না।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার মনসুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন,'পাবনা জেলায় মোট এক হাজার ১৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হয়েছে। তবে, প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম ছিল।'
আগামী দুএক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও আশা করছেন তিনি।