ঢাবিতে অনলাইন-সশরীরে পরীক্ষা, মূল্যায়নে বৈষম্যের শঙ্কা

By সিরাজুল ইসলাম রুবেল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা অনলাইন এবং সশরীরে নেওয়া শুরু হয়েছে৷ সবার জন্য অভিন্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা না নিয়ে দুই পদ্ধতি অনুসরণ করায় মূল্যায়নে বৈষম্য তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী৷

তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে আবাসিক হল খোলার আগেই সশরীরে পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ৷ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মূল্যায়নে সবার জন্য অভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত ছিল৷ অনেক শিক্ষার্থীর বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই।

ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা এবং পরিকল্পনার অভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে দেড় বছর আগেই নিতে পারত৷ এখন দেড় বছর পরে এসে অনলাইনে পরীক্ষা নিচ্ছে৷ অনলাইনে পরীক্ষা শুরু হলে আবার সশরীরে পরীক্ষাও নিতে অনুমতি দিচ্ছে৷ আমি মনে করি, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মূল্যায়নে অভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত৷ অন্যথায় সমান মূল্যায়ন হবে না৷'

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্নাতক শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষার্থীদের জন্য সীমিত পরিসরে হল খুলে দেবে৷ তখন সশরীরে পরীক্ষা দিতে আমাদের সমস্যা হতো না৷ কিন্তু হল খোলার আগেই আমাদের বিভাগ পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করেছে৷ ২৮ আগস্ট থেকে পরীক্ষা শুরু হবে৷ এ মুহূর্তে গ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে কোথায় থাকব? এক মাস অপেক্ষা করে অক্টোবরে হল খোলার পর পরীক্ষা নিলে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হতো না৷ আর এখন পরীক্ষা যদি নিতে হয়, তাহলে অনলাইনে নিতে হবে৷ কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা না শুনে সশরীরে পরীক্ষা নিতে ইতোমধ্যে রুটিন প্রকাশ করেছে৷

হল খোলার আগেই সশরীরে পরীক্ষা

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে আবাসিক হলগুলো খোলার পরিকল্পনা নিয়েছে৷ প্রথম ধাপে স্নাতক শেষ বর্ষ এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষার্থীরা হলে প্রবেশের অনুমতি পাবে৷ কিন্তু হল খোলার আগেই কিছু বিভাগ সশরীরে পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে৷ আবার কিছু শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বিভাগের শিক্ষকরা অনলাইনে পরীক্ষা না দিতে তাদের চাপ প্রয়োগ করে সশরীরে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বলেছে৷

জানা গেছে, হল খোলার আগেই সশরীরে পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, আরবি বিভাগ এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ আরও কিছু বিভাগ৷

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের চূড়ান্ত পরীক্ষা ২৮ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে৷ আর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে ২ সেপ্টেম্বর থেকে৷ ইতোমধ্যে পরীক্ষার রুটিনও প্রকাশ করেছে তারা৷

জুম মিটিংয়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান৷  তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা দিতে নিরুৎসাহিত করেছেন। অনলাইনে পরীক্ষা চলাকালীন কোনো কারণে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নম্বর কর্তন করা হবে বলে অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন। যদিও অনলাইন পরীক্ষার নীতিমালায় এ ধরনের শাস্তির কথা উল্লেখ নেই৷

সশরীরে পরীক্ষা দিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ আছে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা আখতারের বিরুদ্ধেও৷

আরবী বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা সশরীরে পরীক্ষা এবং অনলাইন পরীক্ষার বিষয়ে ফেসবুক গ্রুপে একটি পোল খুলেছেন৷ সেখানে একজনও সশরীরে পরীক্ষার পক্ষে মত দেননি৷ অনলাইনে পরীক্ষা দিতে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ৬১ জন৷ তবে বিভাগ সশরীরে পরীক্ষার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেছে৷

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, 'সশরীরে পরীক্ষা নিতে হলে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে৷ আগামী এক বছরের জন্য পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত৷'

নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়ে ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন পরীক্ষার্থী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস থেকে পাঠানো রুটিনে লেখা পরীক্ষা হবে গুগল ক্লাসরুমে। অর্থাৎ অনলাইনে৷ সেই রুটিনে পরীক্ষা কন্ট্রোলার, পরিচালক, কোর্স কোঅর্ডিনেটর এর সই আছে। এরপর জুমে মিটিং করে ইনস্টিটিউটের পরিচালক পরীক্ষার্থীদের হুমকি দেয় যে, যদি অনলাইনে কেউ পরীক্ষা দেয়, তবে ইন্টারনেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নম্বর কম দেওয়া হবে। এমনকি বহিষ্কারও করা হতে পারে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ, এ মুহূর্তে আমার ঢাকায় যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু বিভাগ জানিয়ে দিয়েছেন আমাকে সশরীরে এসেই পরীক্ষা দিতে হবে৷ আগামী পরশু পরীক্ষা শুরু। আমি এখনও জানি না পরীক্ষা দিতে পারব কি-না।'

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সশরীরে পরীক্ষায় অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগটি সত্য নয়৷ আমরা অনলাইন এবং অফলাইন দুটো পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ রেখেছি৷ আমরা শুধু অনলাইন পরীক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বলেছি কঠোর নজরদারীতে রাখব৷ এবং পরীক্ষা চলাকালীন অনলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নম্বর কর্তন করা হবে, প্রয়োজনে পরীক্ষা বাতিলও হতে পারে৷ কারণ আমরা পরীক্ষায় অসদুপায় বন্ধে কঠোর নজরদারীর জন্য বলেছি৷'

তিনি বলেন, 'আমরা অনলাইনে পরীক্ষা আরও নিয়েছি, সেখানে দেখেছি পরীক্ষার্থীরা ভিডিও থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসদুপায় অবলম্বন করতে৷ যদিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের জানানোর নিয়ম রয়েছে৷ এখন তারা ইমেইল করে আমাদের জানাচ্ছেন যে সশরীরে পরীক্ষা দেবে৷'

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালের সঙ্গে সশরীরে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'একই বিভাগের একই বর্ষে যদি অনলাইন এবং অফলাইন দুটো মাধ্যমে পরীক্ষা হয়, তাহলে বৈষম্য হতে পারে৷ কিন্তু পুরো বর্ষের সব শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা হলে শুধু অনলাইনেই হতে হবে৷ আবার একইভাবে অফলাইনে হলে শুধু অফলাইনেই হতে হবে৷ আবার যদি এক বিভাগে অনলাইনে পরীক্ষা হয়, অন্য বিভাগে অফলাইনে পরীক্ষা হয়, তাহলে তুলনা করলে দুটোতেই কিছু সুবিধা এবং অসুবিধা হতে পারে৷ কিন্তু বিভাগের শিক্ষার্থীরা যদি দুভাবে পরীক্ষা দিতে চায়, তাহলে আমরা না করতে পারি না৷ আমাদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়৷'

শিক্ষার্থীদের সশরীরে পরীক্ষা দিতে চাপ থাকার অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যদি অনলাইনে পরীক্ষা দিতে চায়, তাহলে পরীক্ষা অনলাইনে নিতে হবে৷ আবার শিক্ষার্থী যদি সশরীরে পরীক্ষা দিতে চায়, তাহলে সশরীরে পরীক্ষা নিতে বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে৷ অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পছন্দ কী সেটা বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা নিতে বলা হয়েছে৷

অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে শাস্তি পেতে হবে- এধরনের নিয়ম পরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালায় নেই বলে জানান তিনি৷

সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ক্লাস প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আমাকে জানিয়েছে, তারা অফলাইনে পরীক্ষা দিতে চায়৷ এখন করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বিধায় আমরা পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছি। অবশ্যই শিক্ষার্থীদের মঙ্গলের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে৷

'আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে আলোচনার ভিত্তিতেই পরীক্ষা নেবো৷ বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যদি চায় অনলাইনে পরীক্ষা দিতে, তাহলে অনলাইনে পরীক্ষা হবে৷ আবার তারা যদি চায় অফলাইনে পরীক্ষা হবে, তাহলে অফলাইনে পরীক্ষা নেওয়া হবে৷ আমরা শিক্ষার্থীদের উপর জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাই না৷ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এমন নির্দেশনা দেয়নি৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের স্থগিত সব পরীক্ষা ১৫ জুন থেকে সশরীরে নেওয়ার কথা ছিল এবং বিভাগ নিজ নিজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবাসিক হল না খোলার শর্তে সংশ্লিষ্ট বিভাগ/ইনস্টিটিউট পরীক্ষাগুলো নেবে।

একই শর্তে অন্যান্য সেমিস্টার ফাইনাল, বার্ষিক কোর্স ফাইনাল ও ব্যবহারিক পরীক্ষা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১ জুলাই শুরু হওয়ার কথা ছিল। তখন করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় লকডাউন শুরু হওয়ায় আর সশরীরে পরীক্ষা নেওয়া যায়নি৷ তাই হার্ডওয়্যার ও ওয়েটল্যাব ভিত্তিক ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়া বাকি সব পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর অল্প কিছু বিভাগ অনলাইনে পরীক্ষা শুরু করে৷ এর মধ্যে করোনা শনাক্তের হার কমতে থাকলে সরকার লকডাউন তুলে নেয়৷ সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে অনার্স শেষ বর্ষ এবং মাস্টার্সের পরীক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হবে এবং ধাপে ধাপে অনার্সের শিক্ষার্থীরাও হতে উঠতে পারবেন। গত বুধবার ডিনস কমিটিতেও এই সিদ্ধান্ত সমর্থন পায়৷