দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি পেরিয়ে স্কুলে শিক্ষার্থীরা
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর আজ রোববার স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলেছে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উৎসবমুখর পরিবেশে অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা আনন্দে স্কুলে আসলেও সেহাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা ময়লা পানিতে হেঁটে আসতে হয়েছে।
আজ রোববার সকাল ১০টায় সদর উপজেলার ফতুল্লা ইউনিয়নের সেহাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, স্কুল ফটকের পাশেই জমে আছে ময়লা আবর্জনা। তার ঠিক ১০ মিটার দূর থেকে অনুমানিক ২০০ মিটার সড়কে ভাসছে নর্দমার কালো নোংরা পানি। শিক্ষার্থীরা সেই পানি মাড়িয়ে চলাচল করছে। স্কুল লাগোয়া সড়কের ময়লা পানির দুর্গন্ধ স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ভেতর থেকেও পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ৫ দিন আগেও এ রাস্তায় হাঁটু পানি জমে ছিল। গত ৩ দিন বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কমেছে। কিন্তু নোংরা ময়লা পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আবারও বৃষ্টি হলে এ রাস্তায় হাঁটু পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ফাহিম মৃধা দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, 'অল্প বৃষ্টি হলেই এ রাস্তায় পানি জমে যায়। তখন কষ্ট হয়। জুতা ভিজে যায়। অনেকে পা পিছলে পড়েও গেছে।'
ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মুরাদ হোসেন বলেন, 'সারা বছর এ রাস্তায় নোংরা পানি জমে থাকে। কিছুদিন আগেও এ নোরা পানির ওপর হেঁটে গিয়ে অনলাইন পরীক্ষার খাতা জমা দিতে হয়েছে। কোনো রিকশা এদিকে আসতে চায় না। আসলেও ২০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা চায়।'
অভিভাবকেরা বলছেন, নোংরা পানি মাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা যাওয়া করতে হয়েছে। সেজন্য আগ্রহ থাকলেও শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে চায়নি।
অভিভাবক মাকসুদা খন্দকার সুখী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আজকে প্রথম দিন আমার সন্তান স্কুলে এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে এ রাস্তাটা দেখে। পুরো রাস্তায় নোংরা পানি জমে আছে। এরকম নোংরা ময়লা পানিতে হেঁটে বাচ্চারা আসতেও চায় না। এসব পানি দিয়ে হেঁটে স্কুলে আসলে পায়ে চুলকানি হয়। বাচ্চারা বাসায় গিয়ে কান্নাকাটি করে। আমাদের বাচ্চারা অসুস্থ হোক এটা আমরা চাই না। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন রাস্তার জলাবদ্ধতা নিরসন করা হোক।'
এদিকে এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, বর্তমানে যে পানি জমে আছে সেটা থেকে তারা কখনই মুক্তি পাননি। কারণ আশেপাশের ডাইং কারখানার কেমিকেল মিশ্রিত পানিতে সকাল সন্ধ্যা রাস্তা তলিয়ে যায়। এ পানিতে চলাচল করে অনেকের পায়ে রোগও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আব্দুল বাসেদ বলেন, 'এ রাস্তার আশেপাশে বিভিন্ন ডাইং কারখানা আছে। এসব ডাইং কারখানার কেমিকেল মিশ্রিত কালো নোংরা পানি এ ড্রেন দিয়ে যায়। যার ফলে সারা বছর এ রাস্তায় পানি থাকে। অল্পবৃষ্টি হলে কিংবা ভারি বৃষ্টি হলে এখানে হাঁটু পানি হয়ে যায়। এ পানি আধা কিলোমিটার রাস্তা পর্যন্ত জমে থাকে। এ পানির জন্য এ দুটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের আসা যাওয়ায় খুব কষ্ট হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'বিগত কয়েক বছর ধরে এ জলাবদ্ধতা। প্রখর রোদে কিছুটা শুকনো থাকলেও বৃষ্টি হলে হাঁটু পানি হয়ে যায়। কারণ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ ডাবল লেন সম্প্রসারণ কাজ চলমান থাকায় পানি নিষ্কাশনের রাস্তা সরু হয়ে গেছে। এতে পানি স্বাভাবিক গতিতে সরতে পারে না। তাছাড়া ড্রেনে ময়লা আবর্জনা থাকায় সারা বছর পানি জমে থাকে। এখন ডাইংয়ের পানি যাওয়ার জন্য ভিন্ন রাস্তা কিংবা এ ড্রেনই প্রশস্ত করা না হলে সমস্যা সমাধান হবে না।'
অন্যদিকে, স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন, 'এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতনদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।'
সেহাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন, 'এ জলাবদ্ধতার জন্য শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমরা শিক্ষক-শিক্ষিরাও ভুক্তভোগী। এত পানি জমে যে আমাদের ভ্যানে যাতায়াত করা ছাড়া উপায় থাকে না। জলাবদ্ধতার স্থানীয় সমাধানের জন্য স্কুলের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ময়লা ও ড্রেন পরিস্কার করলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার লুৎফর রহমান স্বপন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তাৎক্ষনিক জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা আপাতত ড্রেনগুলো পরিস্কার করে দিচ্ছি। এতে ড্রেনগুলো গভীর হবে। কিছুটা পানি কমে যাবে। তবে স্থায়ী সমাধান করা যাচ্ছে না। কারণ ডাবল রেল লাইন সম্প্রসারণের জন্য পানি নিষ্কাশনের কালভার্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যে ব্যবস্থা আছে এতে ভালো ভাবে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। আমরা যতবারই রেলওয়ের কাছে দাবি জানিয়েছি ততবারই তারা বলেছে দ্রুত কাজ ধরবে। এখনও কাজ ধরেনি।'
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ বিষয়ে রেলওয়ের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা করছি।'