ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে আতঙ্কে চরবাসী
ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে দুর্গম এলাকা 'হকের চর'। ৯৫০টি পরিবারে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করছেন চরটিতে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ও সাহেবের আলগা এবং চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন চর এলাকায় ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে ৯-১০ বছর আগে 'হকের চর' এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন তারা।
এখন এই চরটি ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। গেল ৪ দিনে ১০টি বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীর উদরে চলে গেছে। গতকাল রোববারও ভাঙনে আতঙ্কে ছিলেন চরের মানুষেরা। তাদের মনে ছিল না ঈদের আনন্দ। এই চরের অনেক অধিবাসীকে নতুন ঠিকানার সন্ধান করতে হচ্ছে।
ভাঙনকবলিত নুর মোহাম্মদ (৫৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঈদের আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার বিকেলে আমার বসতভিটা নদীর উদরে চলে গেছে। এক বিঘা আবাদি জমি ও একটি বাঁশের ঝাড় ছিল, সেগুলোও ভাঙনে বিলীন হয়েছে। এখন আমার ৩টি ঘর অন্যের জমিতে ফেলে রেখেছি। চরটি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে, তাই নতুন চরে আশ্রয়ের জন্য সন্ধান করছি।'
নুর মোহাম্মদের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, '৮ বছর আগে আমাদের বসতভিটা ছিল মাঝের চর এলাকায়। সেখানে বসতভিটা ভেঙে গেলে 'হকের চর' এলাকায় বসতভিটা গড়ে তোলেন। এই চরে ৮ বছর বসবাস করার পর এখন যেতে হচ্ছে অন্য চরে। এভাবে বসবাসের ঠিকানা বদল করার কারণে আমাদের জমানো অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে আমরা বেরোতে পারছি না। জানি না জীবনে আর কতবার ঠিকানা পরিবর্তন করতে হবে।'
ভাঙন-হুমকিতে থাকা আলিম উদ্দিন (৬৫) ডেইলি স্টারকে বলেন, '১০ বছর আগে তিনি "হকের চর" এলাকায় বসতভিটা গড়ে তুলেছি। দুই বিঘা জমি আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। চরটি এখন ভাঙন-হুমকিতে। যে কোনো সময় ভাঙনে হারিয়ে যেতে পারে এই চরটি। এ কারণে আমাদেরকে নতুন ঠিকানার অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। ভাঙনের কারণে ঈদের দিনেও আমরা শান্তিতে ছিলাম না। ঈদের কোনো আনন্দই ছিল না। চোখের সামনেই একের পর এক বসতভিটা ও আবাদি জমি চলে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদীর উদরে। এভাবে ভাঙা-গড়ার জীবন নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে চরাঞ্চলে। ভাঙন আর বন্যার কারণে দারিদ্র্য আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছে।'
আমিনা বেগম (৩৬) ডেইলি স্টারকে বলেন, 'খুব কষ্ট করে "হকের চর" এলাকায় ১০ শতাংশ জমির বসতভিটা গড়েছি। প্রতিবেশীর বসতভিটা ঈদের আগের দিন ভেঙে নদীতে বিলীন হয়েছে। আমাদের বসতভিটা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। যে কোনো সময় চলে যেতে পারে নদীর উদরে। ৪ সন্তান নিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছি। নতুন চরে ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিয়ে বসতভিটা গড়ে তোলার সামর্থ্যও আমার নেই।'
সাহেবের আলগা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সায়েম আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে চরগুলো ১০-২০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। নদীর বুকে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানে গড়ে ওঠে বসতি। এভাবে কেটে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন।'
'১০ বছর হলো "হকের চর" এলাকায় বসতি গড়ে উঠেছে। চরটি এখন ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। চরাঞ্চলে ভাঙনরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ ছাড়া ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেগুলো টিকে থাকে না', যোগ করেন তিনি।