২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

অনিরাময়যোগ্য ক্ষত শুধু শরীরেই নয়

রাশিদুল হাসান

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রায় দিতে দেরি হওয়ায় গত বছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হতাশা ও যন্ত্রণার কথা জানিয়েছিলেন মো. সেলিম ও মাহবুবা পারভীন। শরীরে কয়েকশ স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ কর্মী সেলিম। অবশেষে কয়েক মাস আগে তিনি মারা গেছেন।

খুব একটা ভালো নেই বলে জানান মাহবুবা পারভীনও। গত সোমবার তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শরীরের বিভিন্ন স্থানে এক হাজার ৮০০ এর বেশি স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছি। মাথা ও কিডনিতেও রয়েছে স্প্লিন্টার। হামলার পর থেকে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে মানসিক অবস্থাও দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।'

'আমার বয়স এখন ৫২ বছর। দিন দিন স্মৃতিশক্তি কমতে শুরু করেছে, দৃষ্টিশক্তিও কমে যাচ্ছে। কিছুদিন ধরে নতুন এক সমস্যা শুরু হয়েছে— কান দিয়ে রক্ত পড়ছে', বলতে থাকেন ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবা।

তিনি বলেন, 'এতগুলো সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছি, অথচ মরার আগে দোষীদের বিচারের রায় কার্যকর হওয়া দেখে যেতে পারব কিনা জানি না।'

ফোনে কথা বলার সময় বার বার তার কণ্ঠ ভারী হয়ে যাচ্ছিল। দুর্ভোগের কথা বলতে বলতে তিনি বাম হাত ও বাম পা অবশ বোধ করছিলেন। কয়েকদিন আগে আবার সিঁড়িতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে তার স্বামী ছিলেন সবচেয়ে বড় অবলম্বন। তিনিও কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। 'সারা শরীরের ব্যথার কারণে বেঁচে থাকাটাই এখন আমার কাছে নরক যন্ত্রণার মতো', বলেন মাহবুবা।

তিনি আরও বলেন, 'এত ভোগান্তির পরও যদি বেঁচে থাকতে রায় কার্যকর হওয়া দেখে যেতে পারি, তাহলে সেটাই হবে আমাদের জন্য সান্ত্বনার।'

১৭ বছর আগে ওই ভয়াবহ হামলার পর যখন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, সবাই ভেবেছিলেন তিনি মারা গেছেন। এমনকি তাকে রাখাও হয়েছিল মৃতদের সারিতে। তিন দিন কোমায় থাকার পর প্রথম সাড়া দেন, এরপর আবার ২৫ দিন ধরে অচেতন ছিলেন।

রাশিদা আক্তার রুমাও ওই হামলার শিকার হয়ে এক হাজারেরও বেশি স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে। যখন তিনি হামলার শিকার হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। বর্তমানে ৪১ বছরে বয়সে এসেও মাঝে মাঝে তার শরীরে অসহ্য ব্যথা হয় এবং দিন দিন সেটা বাড়ছেই।

তিনি বলেন, 'জীবদ্দশায় এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত ও মূল পরিকল্পনাকারী তারেক রহমানের শাস্তি দেখে যেতে চাই।'

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার আদালত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৯ আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু না হওয়ায় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। প্রায় আড়াই বছর আগে হাইকোর্ট এই মামলার আপিল আবেদন গ্রহণ করেন।

ওই হামলায় ভয়াবহভাবে আহত হন নাসিমা ফেরদৌসী। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে (মাথা ও বুকে) এখনো দেড় হাজারের বেশি স্প্লিন্টার রয়েছে। এত বেশি স্প্লিন্টারের কারণে চিকিৎসকরা তার এমআরআই করতে পারেননি।

সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) নাসিমা ফেরদৌসী জানান, এই ব্যথা তাকে সারাক্ষণ ওই হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রায় নয় মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন এবং পাঁচ বছর পর হাঁটাচলা করতে শুরু করেন।

'২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার শিকার হওয়া অনেকেই মারা গেছেন। অনেকে আবার আমার মতো অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন', বলেন নাসিমা ফেরদৌসী।

তিনি আরও বলেন, 'বিচারের রায় কার্যকর হওয়া দেখতে পেলে যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হতো।'

২০০৪ সালের ওই গ্রেনেড হামলায় মারা যান ২৪ জন, এ ছাড়া আহত হন অন্তত ৩০০ জন।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সেসময় বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। তবে, ডান কানে আঘাত পান। এ ছাড়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান ওই হামলায় নিহত হন।

এখনো শতাধিক স্প্লিন্টার রয়েছে ৬০ বছর বয়সী নাজিমউদ্দিনের শরীরের বিভিন্ন অংশে। তিনি বলেন, 'যত দিন যাচ্ছে, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা বাড়ছে।'

ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের একজন সহ-সভাপতি বলেন, 'অপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হলে শরীরের যন্ত্রণা উপশম না হলেও মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা কমবে।'

তার মতো আরও অনেকেই বলেন একই কথা। তারা দ্রুত হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।