বিক্ষিপ্ত অশান্তির মাঝে শেষ হলো প্রথম দফার ভোট
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট শেষ হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ১৬ জেলার ১৫২ কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়। এই পর্যায়ে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৭৭ হাজারের বেশি।
এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় এক কোটি ৮৫ লাখ। মহিলা ভোটারের সংখ্যা এক কোটি ৭৫ লাখের বেশি। ভোট নেওয়া হয় সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত।
বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ পার করে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ আসনে। সব মিলিয়ে ভোটদানের হার ৯৫.৩৪ শতাংশ।
বিক্ষিপ্ত অশান্তি
নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছিল।
মোট ২৪০৭ কোম্পানি বাহিনী ছিল ১৬টি জেলায়।
বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে ভোটার ছাড়া কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবু বিভিন্ন জায়গায় গন্ডগোল হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের নওদা ও দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে।
হুমায়ুনের গাড়ি ভাঙচুর
মুর্শিদাবাদের নওদা কেন্দ্রে সকাল থেকেই দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায় তৃণমূল এবং আমজনতা উন্নয়ন পার্টির মধ্যে।
১৭২ নম্বর বুথে আমজনতা উন্নয়নের প্রার্থী হুমায়ুন কবীরের এজেন্টকে বসতে না দেওয়ার অভিযোগ আসে। হুমায়ুন বুথে গেলে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। গো ব্যাক স্লোগান দেওয়া হয় তাকে।
সে সময় দুই শিবিরের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এক পর্যায়ে রাস্তায় চেয়ার নিয়ে বসে পড়েন হুমায়ুন।
নওদার শিবনগর এলাকা থেকে হুমায়ুন বের হওয়ার চেষ্টা করলে তার ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ এসেছে। তার বহরের একটি গাড়িতে ভাঙচুর এবং পোলিং এজেন্টের গাড়িতে ইট ছোড়ার অভিযোগ ওঠে।
হুমায়ুনের গাড়ির সামনে বাঁশ ফেলে গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি উঠেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর চেষ্টায় শেষে বিক্ষোভস্থল থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন হুমায়ুন।
প্রার্থীর দৌড়
উত্তরবঙ্গের কুমারগঞ্জে হামলার শিকার হন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার। চালুন পঞ্চায়েত এলাকায় পোলিং এজেন্টকে বাধা দেওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুষ্কৃতিকারীরা তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ এসেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে তার গাড়ি।
সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মাঠের মধ্যে দিয়ে ছুটছেন শুভেন্দু। পুলিশের সামনেই তাকে মারধর করছে কয়েকজন।
এই ভিডিও ফুটেজে যে হামলাকারীদের দেখা যাচ্ছে, অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল এই ঘটনায় অভিযুক্ত হলেও তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মাথা ফাটল এজেন্টের
বীরভূমের লাভপুরে এজেন্টের ওপর হামলা হয়েছে। বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস ওঝার এজেন্টের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়।
আক্রান্ত এজেন্ট বিশ্বজিৎ মণ্ডল এই ঘটনার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসকে দায় দিয়েছেন। রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পাশাপাশি, মালদার চাঁচলে বিজেপি প্রার্থীর এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। দুষ্কৃতিকারীরা তার গাড়ির কাচ ভেঙে দেয়। ঘটনার পর ওই এজেন্টকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভোট বেহাত
নির্বাচন কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ায় মৃত, স্থানান্তরিত ভোটারদের বাদ দিয়েছে। তবু জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছে। শিলিগুড়ির ২৩৫ নম্বর বুথে এক তরুণী ভোট দিতে এসে দেখেন, তার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।
অভিযোগে চাপানউতোর
ক্ষমতাসীন দল থেকে বিরোধীদলের প্রার্থীরা দিনভর নানা অভিযোগ তুলেছেন। মালদার মালতীপুরের ২২১ নম্বর বুথে জানালা খোলা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন কংগ্রেসের মৌসুম নুর।
কোচবিহারের তুফানগঞ্জে পুলিশ-তৃণমূল সংঘর্ষ হয়। বাঁকুড়ার কোতুলপুরে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী গ্রামে ঢুকে ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ তৃণমূল সমর্থকদের। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বৃদ্ধাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নায় তৃণমূল প্রার্থীকে শুনতে হয়েছে ‘চোর’ স্লোগান। মুর্শিদাবাদের রানীনগরে বুথ জ্যামের অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। কোচবিহার দিনহাটার আইসি বুধাদিত্য রায়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ। এই জেলার সিতাইয়ে বিজেপির এজেন্ট ছুরিকাহত হয়েছেন।
ইভিএমে গন্ডগোল ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতিসক্রিয়তা নিয়ে বহু অভিযোগ উঠেছে। ভোট শুরুর সাত ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতাসীন দল কমিশনে ৭০০ অভিযোগ দায়ের করে।
ইভিএমে কারচুপির অভিযোগে গন্ডগোল বীরভূমে। মুহূর্তে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় খয়রাশোল ব্লকের বুধপুর গ্রাম। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের লক্ষ্য করে শুরু হয় ইটবৃষ্টি।
দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে ভোটকেন্দ্রের কাছে জমায়েতের অভিযোগ। ঝাড়গ্রামের বিনপুরে ঝালমুড়ি বিলির অভিযোগ তৃণমূল ও বিজেপি—দুই দলের বিরুদ্ধেই। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় ঝালমুড়ি বিলি করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদের ডোমকলের সিপিএম সমর্থকদের বাড়িতে আটকে রাখার অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
মোটের ওপরে শান্তিপূর্ণ
ডয়চে ভেলের প্রতিনিধি গৌতম হোড় নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে জানান, প্রচণ্ড কঠোর নিরাপত্তায় ভোট নির্বিঘ্নে হয়েছে। বুথের ভিতরে কেন্দ্রীয় বাহিনী আর বাইরে পুলিশ অবস্থান নেয়।
কোনো অভিযোগ পেলে কুইক রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছেছে। ভোর সাড়ে ছয়টার সময়েই দেখা গিয়েছিল ৫০ জন ভোটারের লম্বা লাইন। সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরুর পরে লাইন দীর্ঘ হয়েছে। প্রচণ্ড গরম বলে মানুষ সকাল-সকাল ভোট দিতে এসেছেন। সেই কারণে ভোটদানের হার দুপুর অবধি বেশি ছিল।
সংখ্যালঘু এলাকাতেও মানুষ ভিড় করেছেন বুথে বুথে। ভোট উপলক্ষে এলাকায় হরতালের আবহ সৃষ্টি হয়। শুধু অল্প কয়েকটি ওষুধ ও মিষ্টির দোকান খোলা ছিল। তবে ভাতের হোটেলগুলোতে ভিড় দেখা যায়।
নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীকে সকালে ভোট দেওয়ার পরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘মানুষ ঠিক করে নিয়েছে কাকে ভোট দেবে। আমার তো তৃণমূলে সংগঠন আছে, তাই চিন্তা নেই।’
ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি স্যমন্তক ঘোষ কোচবিহার থেকে জানিয়েছেন, জেলায় স্পর্শকাতর এলাকাতেও ভোট শান্তিপূর্ণ। ১৪৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী গোটা জেলায় মোতায়েন করা হয়েছিল। বিপুল হারে ভোট পড়ছে। লম্বা লাইন দেখা গিয়েছে বুথে বুথে। এই ভিড়ে দেখা গিয়েছে অনেক পরিযায়ী শ্রমিককে। তারা ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি এসেছেন। এসআইআরের পরে এই প্রথম ভোট দেওয়ার তাগিদ, তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখার তাগিদে—এমনটাই বলেছেন অনেকে।
ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি শময়িতা চক্রবর্তী পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর কেন্দ্র থেকে জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। সকালে কয়েকটি বুথে ইভিএমে গোলযোগ হয়। এখানকার তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকার অভিযোগ করেন, তিনি যেখানে ভোট দিতে গিয়েছিলেন, সেই চত্বরে বিজেপির পতাকা লাগানো ছিল। বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষের জবাব, পতাকা লাগানো নিয়মবিরুদ্ধ হলে খুলে নেওয়া হবে। বিজেপি প্রার্থীর উদ্দেশে একটি জায়গায় জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়।
ভোট দিতে গিয়ে মৃত্যু
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর, কেশপুর, বীরভূমের সিউড়ি ও মালদার মালতীপুরে ভোট দিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এই ভোটাররা।
ভোট নিয়ে প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ দিন কৃষ্ণনগরের জনসভায় বলেন, ‘গত ৫০ বছরে এত কম হিংসা কোনো ভোটে হয়নি। নির্বাচন কমিশন সফল হয়েছে।'
কংগ্রেস নেতা ও বহরমপুরের প্রার্থী অধীর চৌধুরী কমিশনের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এবার ভোট চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গে ঘাঁটি গেড়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সল্টলেকে বিজেপির ওয়ার রুমে ছিলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘এসআইআরের প্রথম পর্যায়ে যে নাম বাদ গিয়েছে, তার ফলে ভোটটা বেড়ে যাচ্ছে। এর পরে মানুষের মধ্যে চিন্তা এসেছে যে, আমার ভোটটা আমাকে দিতেই হবে। একটা ভয়ও আছে, ভোট না দিলে যদি আবার নামটা ভোটার লিস্টে কেটে যায়।'
তিনি বলেন, ‘সাধারণভাবে যখনই এত বেশি হারে ভোট পড়ে, তখন অ্যান্টি ইনকামবেন্সি একটা ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। মুসলমান প্রধান এলাকাতে যাদের ভোট আছে, তারা তো ভোট দেবেনই, কারণ তারা অনেক কষ্টে এসআইআরে নাম তুলেছেন। এই ভয়টা একটা সাধারণ মানুষের মধ্যে আছে। আর আজকে যেখানে ভোট হয়েছে, সেখানে একটা বড় অংশ ছিল সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। সুতরাং ভোটের হার স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। শাসক দলের একটা ফিক্সড ভোট আছে, কিন্তু মূল ভোটটা যাচ্ছে বিজেপির দিকে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এটা যাবে তৃতীয় পরিসরে।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যে যোগদান, যদি শান্তিপূর্ণ না হতো তাহলে মানুষ আসতে পারত না। শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে, মানুষ ভরসা পেয়েছে যে, এই নির্বাচনে এগিয়ে আসা উচিত, আমার কোনো বিপদ ঘটবে না। গুন্ডারা সেভাবে দৌরাত্ম্য দেখাতে পারেনি।''




