কিশোরীকে ৫ বছর আটকে রেখে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৫

রাফিউল ইসলাম

ঢাকার ভাটারা এলাকায় এক কিশোরীকে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগে পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঘটনাটি শুরুর সময় ওই কিশোরীর বয়স ছিল ১৬ বছর। এত বছর ধরে তাকে কখনো বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। কথা বলতে দেওয়া হয়নি পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে। এখন তার বয়স ২১ বছর।

এই নারী আজ বনশ্রীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অফিসে তার সঙ্গে ঘটা নিপীড়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন।

কান্না জড়ানো কণ্ঠে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলছিলেন, 'যখনই আমি আমার মায়ের সঙ্গে এক মিনিটের জন্য কথা বলতে চাইতাম তখন তারা আমাকে আরও বেশি নির্যাতন করত।'

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই নারীকে তার খালা ভাটারা এলাকায় লতা বেগম নামে এক নারীর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে পাঠান। কয়েকদিন পরেই ওই বাসার লোকেরা তাকে আটকে রাখে। নারীদের জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে এমন একটি চক্রের হোতা লতা বেগম।

এদিকে, মেয়ের খোঁজে গোপালগঞ্জ থেকে তার পরিবারের লোকজন লতার বাড়িতে গেলে বলা হয়, সে কিছুদিন থাকার পর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে গেছে। এতে করে মেয়েটির পরিবার ধরেই নেয়, সে নিখোঁজ অথবা মারা গেছে।

এদিকে, এর মধ্যে ভাটারা এলাকা থেকে এক নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং তার পরিবার প্রাথমিকভাবে মরদেহটি শনাক্ত করে।

পিবিআই কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, সেসময় ওই নারীর খালা ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ভাটারা থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় লতার পরিবারের চার সদস্য এবং অজ্ঞাত এক চালককে আসামি করা হয়।

তবে ওই মরদেহের সঙ্গে নিখোঁজের বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনার মিল না পাওয়ায় পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, মৃতটি নিখোঁজ কিশোরীর নয়।

মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও তারা ছয় মাস পর জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে।

২০১৯ সালের জুন মাসে ভাটারা থানার পুলিশ ঢাকার একটি আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে মামলায় ত্রুটির কথা উল্লেখ করে।

পিবিআই কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ওই কিশোরী নিখোঁজ থাকায় আদালত পিবিআইকে মামলাটি পুনরায় তদন্ত করার নির্দেশ দেন।

সম্প্রতি ওই কিশোরী গোপালগঞ্জে তার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা জানতে পারে পিবিআই। পরে তার সঙ্গে কথা বলে পুলিশ বিস্তারিত জানতে পারে।

মিজানুর রহমান জানান, ওই কিশোরী অসুস্থ ছিলেন। তার কিছু মানসিক সমস্যাও হয়েছিল। এ কারণে তাকে ওই চক্রের সদস্যরা ছেড়ে দেয়। চার থেকে পাঁচ মাস আগে তাকে মাদারীপুরে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে সে কোনোভাবে তার আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছাতে পারে।

আজ বুধবার পিবিআই এসপি তার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ওই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন-লতা বেগম, লতার স্বামী বাসির মিয়া, তাদের দুই ছেলে রাব্বি ও আল আমিন এবং গাড়িচালক সোহাগ।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে ওই নারী জানান, সোহাগ, রাব্বি ও আল আমিন ঢাকার বিভিন্ন বাড়িতে তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করে।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেয়েটির খালা ২০১৬ সালে তাকে লতার বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসেবে, সেখানে তিনি মাত্র সাত দিন ছিলেন। পরে সোহাগ তাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। লতার দুই ছেলেও তাকে সেখানে ধর্ষণ করে।

পরে তারা তাকে জোর করে পতিতাবৃত্তিতে পাঠায় এবং অন্যান্য বাসায় নিয়ে যায়। বন্দী অবস্থায় তাকে বেশ কয়েকটি বাসায় পাঠানো হয়েছিল।

পিবিআই কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, লতা এই চক্রের মূল হোতা। তিনি বিভিন্ন বয়সী নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতেন। ওই কিশোরীর খালাও মামলাটি আর না চালানোর কথা বলে লতার কাছ থেকে টাকা নিতেন।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত সুপার মো. শামসুজ্জামান বলেন, 'আমরা গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ জন এবং ভুক্তভোগীর খালার বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় মামলা করতে যাচ্ছি। তদন্তের সময় যদি অন্যদের নাম আসে, তাদেরও এই মামলায় আসামি করা হবে।'

ভুক্তভোগীর মা বলেন, 'আমরা মেয়েকে ফিরে পেয়ে আনন্দিত। অপরাধীদের বিচার চাই।'